আজকাল ওয়েবডেস্ক: স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কেবল দাম্পত্য কলহ বা মনোমালিন্য থাকলেই, কোনও জীবনসঙ্গীকে তাঁর সঙ্গীর আত্মহত্যার প্ররোচনার দায়ে অভিযুক্ত করা যায় না। স্বামীর আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে এক মহিলার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা খারিজ করে দিয়ে বম্বে হাইকোর্ট এক রায়ে এই পর্যবেক্ষণ দিয়েছে।
হাইকোর্টের নাগপুর বেঞ্চ গত সপ্তাহে দেওয়া এক আদেশে উল্লেখ করেছে যে, পারিবারিক জীবনে দাম্পত্য কলহ একটি সাধারণ বিষয়। তাই কেবল দাম্পত্য বিরোধের অজুহাতে স্বামী বা স্ত্রী - কারোর ওপরই আত্মহত্যার দায় চাপানো যায় না। আদালত আরও যোগ করে যে, আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগ প্রমাণ করতে হলে অভিযুক্তের পক্ষ থেকে ভুক্তভোগীকে মৃত্যুর পথ বেছে নেওয়ার জন্য সরাসরি উস্কানি বা প্ররোচনা দেওয়ার বিষয়টি অবশ্যই থাকতে হবে।
বম্বে হাইকোর্টের নাগপুর বেঞ্চ বলেছে, " দাম্পত্যে এক সঙ্গীর প্ররোচনার কারণেই অপর সঙ্গী আত্মহত্যা করেছেন। এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়।"
২০১৯ সালের ২৬ নভেম্বরের ঘটনা। মহারাষ্ট্রের আমরাবতী জেলায় এক ব্যক্তি ট্রেনের নীচে ঝাঁপ মেরে আত্মহত্যা করেন। ঘটনার পর মৃতের বাবা পুত্রবধূর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন। পুত্রবধূই নাকি তুচ্ছ বিষয়ে অকারণ স্বামীর সঙ্গে সবসময় ঝগড়া করতেন, গালাগাল দিতেন এবং স্বামীর অনুমতি ছাড়াই বারবার বাপের বাড়ি চলে যেতেন।
আরও অভিযোগ, মহিলা স্বামীকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর হুমকিও দিতেন। এর জেরেই মানসিক যন্ত্রণা বাড়ছিল ছেলের। একসময়ে আর তা সহ্য করতে না পেরেই আত্মহত্যা করেন ছেলে। ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বর মাসে ওই দম্পতির বিয়ে হয়। ওই ব্যক্তি এবং তাঁর বাবা-মা অভিযোগ করেছিলেন যে, ওই মহিলার তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতেন এবং স্বামীকে শারীরিকভাবে নির্যাতনও করতেন। এছাড়া তিনি আত্মহত্যা করার এবং তাঁদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকিও দিতেন।
শ্বশুরবাড়ির লোকজন আরও অভিযোগ করেন যে, ওই মহিলার অন্য এক পুরুষের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক ছিল এবং তিনি কাউকে কিছু না জানিয়েই বেশ কয়েক দিনের জন্য শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।
এই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ, স্বামীর আত্মহত্যায় স্ত্রীকে অভিযুক্ত করে মামলা দায়ের করে।
এই মামলার বিরুদ্ধেই পেশায় শিক্ষিকা ৪৯ বছর বয়সী স্ত্রী বম্বে হাইকোর্টে আবেদন করেন। তাঁর দাবি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। তাঁকে ফাঁসানো হয়েছে। সেই আবেদনের প্রেক্ষিতে মামলাটি খতিয়ে দেখে বিচারপতি উর্মিলার জোশী ফালকের একক বেঞ্চ গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। পর্যবেক্ষণ জানানো হয় যে, বর্তমান মামলায় স্বামী ও স্ত্রী - উভয়েই একে অপরের বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহার ও নির্যাতনের অভিযোগ এনেছিলেন। তাই সর্বোচ্চ যা বলা যেতে পারে তা হল, ওই মহিলার আচরণ হয়তো স্বামীর মনে হতাশার সৃষ্টি করে থাকতে পারে।
হাইকোর্ট আরও বলেছে, "পারিবারিক জীবনে এ ধরনের কলহ ও মতপার্থক্য খুবই সাধারণ বিষয়। অভিযুক্তের মনে কোনও অপরাধমূলক উদ্দেশ্য না থাকলে, সাধারণত এটি প্রমাণ করা সম্ভব নয় যে ওই মহিলাই তাঁর স্বামীর মৃত্যুর জন্য দায়ী ছিলেন।"
আদালত তার আদেশে উল্লেখ করেছে যে, আত্মহত্যার প্ররোচনার দায়ে কাউকে অভিযুক্ত করতে হলে রাষ্ট্রপক্ষকে অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে যে, অভিযুক্ত ব্যক্তির, আত্মহত্যার ঘটনায় কোনও ভূমিকা রয়েছে, অথবা ভুক্তভোগীকে আত্মহত্যায় উৎসাহিত করেছিলেন, কিংবা অন্য কারোর সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে ভুক্তভোগীর আত্মহত্যা নিশ্চিত করেছিলেন।
হাইকোর্ট পুনরায় জোর দিয়ে বলেছে যে, আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগ প্রমাণ করতে হলে অভিযুক্তের পক্ষ থেকে ভুক্তভোগীকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করার মতো সরাসরি উস্কানি বা প্ররোচনা অবশ্যই থাকতে হবে।
বেঞ্চ আরও জানিয়েছে যে, স্বামী বা স্ত্রীর মধ্যে কেউ যদি রাগের মাথায় বা ক্ষোভের বশে কোনও কথা বলে থাকেন, তবে কেবল সেই কথাগুলোই আত্মহত্যার প্ররোচনার অপরাধ হিসেবে গণ্য হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। আদালত পর্যবেক্ষণ করেছে যে, ওই ব্যক্তি আত্মহত্যার আগে যে চিরকুটটি রেখে গিয়েছিলেন, তার কোথাও এমন কোনও ইঙ্গিত নেই যে - ওই নারীর প্ররোচনার ফলেই তিনি আত্মহত্যা করেছেন। বরং ওই চিরকুটে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তাঁর মৃত্যুর জন্য কাউকে দায়ী করা যাবে না।
















