বিভাস ভট্টাচার্য
দেশে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কংগ্রেসকে সামনে রেখেই লড়াই করবে মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস। সোমবার দিল্লিতে 'ইন্ডিয়া' জোটের বৈঠকে এবিষয়ে বার্তা দিয়ে দিয়েছেন খোদ তৃণমূল নেত্রী। সভায় উপস্থিত একটি সূত্র জানিয়েছে, এদিনের বৈঠকে মমতা জানিয়েছেন কংগ্রেসকে সামনে রেখেই লড়াই করা হবে। তবে লড়াইটা শুধু কথাবার্তার মধ্যে নয়, রাস্তায় নেমেই সেটা করতে হবে। ওই সূত্রটি জানিয়েছে, এদিনের বৈঠকে কীভাবে গত বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ভোট লুঠ করেছে সেই বিষয়টি নিয়েও সরব হয়েছেন মমতা।
প্রসঙ্গত এর আগে রাজ্যে তৃণমূল যখন ক্ষমতাসীন ছিল তখন 'ইন্ডিয়া' জোটের নেতৃত্বে মমতাকেই সামনে রাখা উচিত বলে সওয়াল করেছিলেন তৎকালীন তৃণমূল নেতৃত্ব। কিন্তু রাজ্যে পালাবদল এবং সেইসঙ্গে দলের মধ্যে এই বিদ্রোহের জন্য রাজ্য তথা জাতীয় রাজনীতিতে বেশ কিছুটা 'অস্বস্তিকর' জায়গায় রয়েছে মমতার নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই মুহূর্তে জাতীয় রাজনীতিতে মমতার অন্যতম ভরসার জায়গা কংগ্রেস। কারণ, এই দল যেমন একদিকে তাঁর পুরনো দল পাশাপাশি সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী-সহ অন্যান্য কংগ্রেস নেতৃত্বের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক ভালো। নির্বাচনের পর সোনারপুরে যখন অভিষেক ব্যানার্জির উপর হামলা হয়েছিল তখন দেশের অন্যান্য বেশ কয়েকজন নেতার মতো রাহুল গান্ধী মমতাকে ফোন করে অভিষেকের খবর নেন। এমনকী প্রয়োজনে অভিষেকের চিকিৎসার ব্যবস্থা হায়দরাবাদে করার অনুরোধও করেন তিনি। ফলে একদিকে পুরনো সম্পর্ক অন্যদিকে কংগ্রেস যেহেতু লোকসভায় প্রধান বিরোধী দল সেকারণে মমতা এই মুহূর্তে কংগ্রেসকেই আরও কাছে পেতে চাইবেন।
সোমবারের বৈঠকের যে ছবি প্রকাশ্যে এসেছে, তাতে কংগ্রেস নেত্রী সনিয়া গান্ধীর পাশের আসনেই বসতে দেখা গিয়েছে তৃণমূলনেত্রীকে। মমতার পাশের আসনে ছিলেন পিডিপি নেত্রী মেহবুবা মুফতি। সনিয়ার ডান পাশে ছিলেন কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে এবং লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী।
বিজেপি-বিরোধী দলগুলির জোট ‘ইন্ডিয়া’ তৈরি হয়েছিল ২০২৩ সালে। ওই বছরের জুনে পটনায় প্রথম বৈঠক বসেছিল। তখন ১৫টি দল যোগ দিয়েছিল বৈঠকে। তার পরের মাসে বেঙ্গালুরু বৈঠকে আনুষ্ঠানিক ভাবে আত্মপ্রকাশ করেছিল ‘ইন্ডিয়া’। কংগ্রেসকে কেন্দ্র করে ঘোষিত হয় ২৬টি বিরোধী দলের জোট। তবে ওই সময়ে বিরোধী জোটের বৈঠকে ‘প্রধান মুখ’ হিসাবে রাহুল গান্ধী, সনিয়া গান্ধী, মল্লিকার্জুন খাড়গেদের পাশাপাশি ছিলেন নীতীশ কুমার, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অরবিন্দ কেজরিওয়াল, এমকে স্ট্যালিন, সীতারাম ইয়েচুরিরা।
তাঁদের দল তখন বিজেপি-বিরোধী শক্তি হিসাবে কোনও না কোনও রাজ্যে ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু গত তিন বছরে ক্রমে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে এই আঞ্চলিক দলগুলি। শুধু পঞ্জাবে এবং ঝাড়খণ্ডে ক্ষমতায় রয়েছে আপ এবং জেএমএম। তবে কেজরিকে অনেক আগেই দিল্লি থেকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে বিজেপি। নীতীশ কুমারের কেউ আবার শিবির বদলে শাসক জোট এনডিএ-তে গিয়েছে। কংগ্রেসও তাদের দুর্বল ভাবমূর্তি বদলাতে পারেনি। এই পরিস্থিতিতে ক্রমেই 'ইন্ডিয়া' জোটের মুখ হিসেবে উঠে আসছিলেন মমতা। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর ক্রমেই কোনঠাসা হয়ে পড়েছেন মমতা। দলও বিরাট ভাঙনের মুখে। সেই কারণেই এবার এক পা পিছিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়ে কংগ্রেসকে এগিয়ে দিতে চাইছেন তৃণমূল নেত্রী? দিল্লিজুড়ে এখন এই নিয়েই জল্পনা।
বৈঠকে বক্তব্য পেশের সময় মমতা উল্লেখ করেন তাঁর দলের দুই সাংসদ অভিষেক ব্যানার্জি এবং কল্যাণ ব্যানার্জির উপর আক্রমণের বিষয়টি। বৈঠকে উপস্থিত অন্য একটি সূত্র জানায়, বক্তব্য পেশের সময় মমতা কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন।
ওই সূত্রটি জানিয়েছে, পরবর্তী সময়ে রাহুল গান্ধী যখন বক্তব্য পেশ করেন তখন তিনি জানান, কংগ্রেস তার আদর্শ ও ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনে সামিল হবে। যার মধ্যে রয়েছে পরিবেশ বা কীভাবে বড় ব্যবসায়ীদের হাতে দেশের অধিকাংশ জিনিস 'নিয়ন্ত্রিত' হচ্ছে সেই বিষয়গুলি। এদিনের বৈঠকে উপস্থিত বামপন্থী দলগুলির প্রতিনিধিরা বলেন, 'ইন্ডিয়া' জোটকে যদি দেশে বিজেপি বিরোধী সর্বাত্মক আন্দোলন গড়ে তুলতে হয় তাহলে নিজেদের মধ্যে নিয়মিত বৈঠক করা জরুরি।















