আজকাল ওয়েবডেস্ক: জম্মুর পুরনো শহরের লিংক রোড, পুরানি মাণ্ডি, কচ্ছি চাওনি, পাঞ্জতির্থি, মুবারক মাণ্ডি বা জৈন বাজার—এই এলাকাগুলিতে ৪৫ বছরের বেশি বয়সী প্রায় প্রত্যেকেরই ৬৩ বছর বয়সী কামাল সিং জামওয়ালকে নিয়ে কোনও না কোনও স্মৃতি রয়েছে। কিন্তু এক প্রবীণ সাংবাদিকের মন্তব্যেই যেন তার চরিত্রের সারমর্ম ধরা পড়ে। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তিনি দ্যা ওয়্যার-কে বলেন, “ও আসলে ‘হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটির পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট’। যেকোনও বিষয় নিয়ে ঝগড়া বাধাতে প্রস্তুত—কাশ্মীর বনাম জম্মু, বিজেপি বনাম কংগ্রেস, ভারত বনাম পাকিস্তান, হিন্দু বনাম মুসলমান। আলোচনা চলাকালে ও প্রায়ই সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরে বেড়ানো যাচাই না করা বা ভুয়ো তথ্য উদ্ধৃত করত।”
এই কামাল সিং জামওয়ালই বুধবার (১১ মার্চ) জম্মুর একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে প্রাক্তন জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ফারুক আবদুল্লাহ-কে গুলি করে হত্যার চেষ্টা করেন। ঘটনাস্থলেই তাকে আটক করা হয় এবং পরে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। জানা গেছে, গ্রেপ্তারের সময় তিনি মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন এবং বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন।
ঘটনাটি ঘটে এক পারিবারিক বিয়ের অনুষ্ঠানে। সেখানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ফারুক আবদুল্লাহ। তার সঙ্গে ছিলেন জম্মু ও কাশ্মীরের উপমুখ্যমন্ত্রী সুরিন্দর চৌধুরী এবং মুখ্যমন্ত্রীর উপদেষ্টা নাসির আসলাম ওয়ানি। জামওয়াল ছিলেন বরের পক্ষের অতিথি। কনের বাবা জম্মুর এক প্রবীণ আইনজীবী ডি. এস. চৌহান। অনুষ্ঠানের শেষে যখন ফারুক আবদুল্লাহ বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, তখনই জামওয়াল আচমকা পকেট থেকে পিস্তল বের করে গুলি চালানোর চেষ্টা করেন। উপস্থিত অতিথিরা দ্রুত তাকে ধরে ফেলায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো যায়।
গ্রেপ্তারের পরেও জামওয়ালের মধ্যে কোনও অনুতাপ দেখা যায়নি। পুলিশ ও সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন যে তিনি গত ২০ বছর ধরে ফারুক আবদুল্লাহকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন এবং সুযোগ পেয়ে সেই চেষ্টা করেছেন। কেন তিনি এমনটা করতে চেয়েছিলেন, সেই প্রশ্নের উত্তরে তিনি শুধু বলেন, “মেরা আপনা মকসদ হ্যায়”—অর্থাৎ তার নিজের একটি উদ্দেশ্য ছিল। পেশা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, তিনি কোনও কাজ করেন না; পুরানি মাণ্ডি এলাকায় থাকা তার দুই-তিনটি দোকানের ভাড়া থেকেই তার আয়।
বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ঘটনার আগে থেকেই জামওয়াল অতিথিদের সঙ্গে উত্তপ্ত তর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তিনি প্রশ্ন তুলছিলেন কেন কাশ্মীর উপত্যকার নেতাদের বিয়েতে আমন্ত্রণ করা হয়েছে। ওই প্রত্যক্ষদর্শীর মতে, এ ধরনের আচরণ তার নতুন নয়। জম্মুর নানা সামাজিক অনুষ্ঠানে তাকে প্রায়ই তর্ক ও ঝামেলায় জড়াতে দেখা গেছে। কিছুদিন আগেই এক বিজেপি নেতার ছেলের বিয়েতে তিনি উচ্চস্বরে বিতর্ক শুরু করেছিলেন এই অভিযোগ তুলে যে জম্মু নাকি কাশ্মীরি নেতাদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। তার রাগী স্বভাবের কারণে অনেকেই তাকে এড়িয়ে চলতেন।
পুরানি মাণ্ডির এক ব্যবসায়ী জানান, জামওয়ালের অতীতে কিছু রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাও ছিল। এক সময় তিনি ভীম সিং-এর প্রতিষ্ঠিত প্যান্থার্স পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু গত দুই দশকে তিনি ক্রমশ আরএসএস ঘনিষ্ঠ বৃত্তে চলে যান এবং এরপর থেকেই তাকে আরও বেশি উগ্র ও বিভাজনমূলক বক্তব্য দিতে দেখা যেত। ওই ব্যবসায়ীর দাবি, কিছুদিন আগেই এক আলোচনার সময় জামওয়াল বলেছিলেন যে কাশ্মীরি নেতাদের বিরুদ্ধে শুধু পাথর ছোড়া নয়, তার থেকেও “শক্তিশালী পদ্ধতি” ব্যবহার করার সময় এসেছে। তখন অনেকেই তার কথাকে রাগের মাথায় বলা মন্তব্য হিসেবেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন।
আরেক স্থানীয় ব্যবসায়ী তাকে “মানসিকভাবে অস্থির ও অপরিণত” বলে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, জামওয়াল বিভিন্ন আন্দোলনে সক্রিয় থাকলেও খুব বেশি পরিচিত ছিলেন না। অমরনাথ যাত্রা সংক্রান্ত আন্দোলন কিংবা মাতাভৈষ্ণোদেবী বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিবিএস ভর্তি বিতর্ক—এসব ক্ষেত্রেও তাকে সামনে দেখা গিয়েছিল। তবে তার কথাবার্তা প্রায়ই অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠত এবং তিনি বারবার বলতেন যে শুধু প্রতিবাদ নয়, তার চেয়েও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
এক প্রবীণ সাংবাদিক আরও জানান, জামওয়ালের দূর সম্পর্ক রয়েছে এক প্রাক্তন সিনিয়র পুলিশ আধিকারিকের সঙ্গে। কিন্তু তার চরমপন্থী মতাদর্শের কারণে অনেকেই সেই সম্পর্ক প্রকাশ্যে আনতে চাইতেন না। এমনকি পারিবারিক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানালেও অনেকেরই ভয় থাকত—সে যদি সেখানে কোনও ঝামেলা বাধিয়ে দেয়।
এই ঘটনার পর জম্মুর পুরনো শহরের বহু মানুষ স্তম্ভিত হলেও কেউ কেউ বলছেন, জামওয়ালের দীর্ঘদিনের আচরণ দেখলে ঘটনাটি পুরোপুরি অপ্রত্যাশিতও নয়। অনেকের মতে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভুয়ো তথ্য ও বিভাজনমূলক রাজনৈতিক প্রচারের প্রভাব কীভাবে কিছু মানুষের মানসিকতাকে ক্রমশ চরমপন্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে, এই ঘটনাটি তারই এক উদ্বেগজনক উদাহরণ।
