আজকাল ওয়েবডেস্ক: দিল্লির প্রখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় জেএনইউ আবারও জাতীয় বিতর্কের কেন্দ্রে। এবার বিতর্কের সূত্র প্রশাসনের সিদ্ধান্ত—বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রথমবার ছাত্র সংসদের সম্পূর্ণ কেন্দ্রীয় প্যানেলকে একসঙ্গে বহিষ্কার করা হয়েছে। একই সঙ্গে সামনে এসেছে পিএইচডি ভর্তি প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ নীতির গুরুতর লঙ্ঘনের অভিযোগ। ফলে শিক্ষাঙ্গনে প্রশাসনের ভূমিকা, স্বচ্ছতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

জেএনইউ প্রশাসন সম্প্রতি ছাত্র সংসদের সভাপতি, সহ-সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও যুগ্ম সম্পাদকসহ পুরো কেন্দ্রীয় প্যানেলকে বহিষ্কার করেছে। বহিষ্কৃতদের মধ্যে রয়েছেন বর্তমান সভাপতি আদিতি মিশ্র, সহ-সভাপতি গোপিকা কে. বাবু, সাধারণ সম্পাদক সুনীল যাদব, যুগ্ম সম্পাদক দানিশ আলি এবং প্রাক্তন সভাপতি নীতিশ কুমার। অভিযোগ, তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের বি. আর. আম্বেদকর কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে মুখের পরিচয় শনাক্তকরণ প্রযুক্তি (Facial Recognition Technology বা FRT) বসানোর বিরোধিতা করেছিলেন এবং একই সঙ্গে গ্রন্থাগারে পড়ার জায়গা বাড়ানোর দাবি তুলেছিলেন।

এই সিদ্ধান্তের ফলে বর্তমানে জেএনইউ কার্যত ছাত্র সংসদহীন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু ছাত্রছাত্রী এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছেন। তাদের দাবি, অবিলম্বে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করতে হবে এবং ছাত্র প্রতিনিধিত্ব ফেরাতে করতে হবে। ছাত্রদের দাবি শুধু বহিষ্কার প্রত্যাহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তারা University Grants Commission (ইউজিসি)-এর সমতা নীতি বাস্তবায়ন, প্রস্তাবিত ‘রোহিত আইন’ কার্যকর করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগ্রহণকারী সংস্থা—অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল ও বোর্ড অব স্টাডিজে ছাত্র প্রতিনিধিত্ব পুনর্বহালের দাবিও তুলেছেন।

প্রাক্তন ছাত্র সংসদ সভাপতি নীতিশ কুমারের বক্তব্য, ২০১৮ সালের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী ছাত্র প্রতিনিধিরা অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল ও বোর্ড অব স্টাডিজে থাকতেন। কিন্তু এরপর থেকে ছাত্র প্রতিনিধিত্ব বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, প্রশাসন জবাবদিহি এড়াতেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যাতে ছাত্রদের প্রশ্ন বা আপত্তি ছাড়াই নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।

এই বিতর্কের মধ্যেই সামনে এসেছে ২০২১–২২ শিক্ষাবর্ষে জেএনইউর পিএইচডি ভর্তি প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর অভিযোগ। তথ্য জানার অধিকার আইনের মাধ্যমে পাওয়া নথি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিভিন্ন স্কুলের অন্তত ২৭টি কেন্দ্রের ভর্তি প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ নীতি যথাযথভাবে মানা হয়নি। বহু ক্ষেত্রে তফসিলি জাতি (SC), তফসিলি উপজাতি (ST), ওবিসি এবং অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল (EWS) শ্রেণির ছাত্রছাত্রীরা লিখিত পরীক্ষায় বেশি নম্বর পেলেও সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকা হয়নি।

সেই সময় পিএইচডি ভর্তি পরীক্ষায় লিখিত পরীক্ষার নম্বর ছিল ৭০ শতাংশ এবং ভাইভা ৩০ শতাংশ। কিন্তু তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাধারণ বিভাগের বহু ছাত্র বেশি নম্বর পেয়েছেন সাক্ষাৎকারে, অথচ সংরক্ষিত শ্রেণির ছাত্রদের বড় অংশকে খুব কম নম্বর দেওয়া হয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ, সাধারণ বিভাগের প্রায় ৪৮ শতাংশ ছাত্র ভাইভায় ২০ বা তার বেশি নম্বর পেয়েছেন। কিন্তু ওবিসি ছাত্রদের মধ্যে এই হার মাত্র ৮ শতাংশের মতো, আর এসসি ও এসটি ছাত্রদের ক্ষেত্রে প্রায় ৬ শতাংশ। অন্যদিকে খুব কম নম্বর—৫ বা তার নিচে—পাওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ বিভাগের হার মাত্র প্রায় ৩ শতাংশ হলেও, ওবিসি ছাত্রদের ক্ষেত্রে তা প্রায় ২৭ শতাংশ এবং এসসি ও এসটি ছাত্রদের ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশেরও বেশি।

এই বৈষম্যের অন্যতম শিকার বলে দাবি করেছেন জেএনইউর সেন্টার ফর স্টাডি অব রিজিওনাল ডেভেলপমেন্টের গবেষক স্নেহা সাহা। তিনি জানান, লিখিত পরীক্ষায় তিনি সাধারণ বিভাগের কাট-অফের থেকেও বেশি নম্বর পেয়েছিলেন, তবুও তাঁকে ভাইভা পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়নি। ফলে তাঁকে এক বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। তাঁর কথায়, “আমার জীবনের সেই এক বছর কে ফিরিয়ে দেবে?”

তদন্তে আরও জানা যায়, সেই বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল একটি বিশেষ ধারা যুক্ত করেছিল, যার ফলে সংরক্ষিত শ্রেণির ছাত্ররা সাধারণ বিভাগের কাট-অফের চেয়ে বেশি নম্বর পেলেও তাদের সাধারণ বিভাগে বিবেচনা করা হতো না। এই নিয়মটি ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একাধিক রায়ের পরিপন্থী বলে দাবি করছেন শিক্ষাবিদরা। বিশেষ করে Indra Sawhney v. Union of India এবং Saurav Yadav v. State of Uttar Pradesh সহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মামলায় আদালত স্পষ্ট বলেছে—সংরক্ষিত শ্রেণির প্রার্থী সাধারণ কাট-অফের চেয়ে বেশি নম্বর পেলে তাকে সাধারণ বিভাগে মেধার ভিত্তিতে বিবেচনা করতে হবে।

এই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন Mamidala Jagadesh Kumar। তিনি ২০১৬ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত জেএনইউর উপাচার্য ছিলেন এবং পরে ইউজিসির চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। ছাত্র সংগঠন ও গবেষকদের অভিযোগ, তাঁর আমলে একাধিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত জেএনইউর দীর্ঘদিনের সামাজিক ন্যায়বিচারের ঐতিহ্যকে দুর্বল করেছে।

গবেষকরা আরও উল্লেখ করেছেন যে, জেএনইউতে সাক্ষাৎকারে বৈষম্যের বিষয়টি নতুন নয়। অতীতে এই সমস্যা নিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কমিটি রিপোর্টও প্রকাশিত হয়েছিল—যেমন রাজীব ভাট কমিটি (২০১২), এস. কে. থোরাট কমিটি (২০১৩) এবং আব্দুল নাফে কমিটি (২০১৬)। এই সব কমিটিই সংরক্ষিত শ্রেণির ছাত্রদের ভাইভা পরীক্ষায় কম নম্বর দেওয়ার প্রবণতার কথা তুলে ধরেছিল এবং সংশোধনের সুপারিশ করেছিল।

তবে সমালোচকদের অভিযোগ, এই সুপারিশ বাস্তবায়নের বদলে প্রশাসন ছাত্র প্রতিনিধিত্বই তুলে দিয়েছে। তাদের মতে, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ছাত্র প্রতিনিধিত্ব পুনর্বহাল করা জরুরি, পাশাপাশি স্বাধীন মতের শিক্ষক সদস্যদেরও সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা থাকা প্রয়োজন।

বর্তমানে পিএইচডি ভর্তিতে সাক্ষাৎকারের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কিছু ক্ষেত্রে জেআরএফ ক্যাটাগরিতে ভাইভার ওজন প্রায় পুরোপুরি নির্ধারক হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ। ফলে শিক্ষাবিদদের আশঙ্কা, যদি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করা হয়, তবে ভবিষ্যতে বৈষম্যের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। এই পরিস্থিতিতে জেএনইউতে ছাত্র আন্দোলন আবারও জোরালো হয়ে উঠছে। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য ছিল গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ ও সামাজিক ন্যায়বিচার। সেই ঐতিহ্য রক্ষার লড়াইই এখন তাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।