আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভারতে জমির মালিকানা মানে কেবল অর্থনৈতিক সচ্ছলতা নয়, এটি সামাজিক মর্যাদা, ক্ষমতা এবং নিরাপত্তার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু সম্প্রতি 'ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি ল্যাব'-এর একটি গবেষণায় ভারতের গ্রামীণ সমাজে জমির মালিকানার ক্ষেত্রে যে চরম বৈষম্যের চিত্র ফুটে উঠেছে, তা রীতিমতো উদ্বেগজনক। নিতিন কুমার ভারতী এবং তাঁর সহ-গবেষকদের তৈরি 'ল্যান্ড ইনইকুয়ালিটি ইন ইন্ডিয়া: নেচার, হিস্ট্রি, অ্যান্ড মার্কেটস' শীর্ষক এই গবেষণাপত্রটি ভারতের প্রায় ২ লক্ষ ৭০ হাজার গ্রাম এবং ৬৫০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে তৈরি করা হয়েছে। এই রিপোর্টে দেখা গেছে, ভারতের মাত্র ১ শতাংশ উচ্চবিত্ত পরিবারের হাতে দেশের মোট জমির ১৮ শতাংশ কুক্ষিগত রয়েছে, যেখানে গ্রামীণ ভারতের ৪৬ শতাংশ পরিবারের কাছে নিজেদের বলতে কোনও জমিই নেই।
গবেষণার সবচেয়ে চমকপ্রদ এবং বিড়ম্বনাপূর্ণ দিকটি হল জমির উর্বরতার সাথে বৈষম্যের সম্পর্ক। সাধারণত মনে হতে পারে উর্বর জমি মানুষের সমৃদ্ধি বাড়াবে, কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে যেসব এলাকার জমি যত বেশি উর্বর এবং যেখানে সেচের সুব্যবস্থা রয়েছে, সেখানে জমির মালিকানার বৈষম্য তত বেশি। উদাহরণস্বরূপ, সরকারি সেচ প্রকল্পের আওতাভুক্ত এলাকায় জমির উৎপাদনশীলতা বাড়লেও তার সুফল মূলত বড় জমিদাররাই ভোগ করছেন, যার ফলে ছোট চাষিরা জমি হারিয়ে ভূমিহীন হয়ে পড়ছেন। তথ্য বলছে, সেচ প্রকল্পের অধীনে থাকা এলাকাগুলোতে জমির বৈষম্য বা 'গিনি কোঅফিসিয়েন্ট' প্রায় ১ শতাংশ বেড়ে যায়।
&t=1sএই বৈষম্যের শিকড় অনেক গভীরে, বিশেষ করে ঔপনিবেশিক আমলের শাসনব্যবস্থার মধ্যে প্রোথিত। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব এলাকা এককালে ব্রিটিশদের সরাসরি শাসনে 'জমিদারি প্রথা'র অধীনে ছিল, সেখানে আজও জমির বৈষম্য অনেক বেশি। তুলনায় যেসব এলাকা 'দেশীয় রাজ্য' বা প্রিন্সলি স্টেটের অধীনে ছিল, সেখানে ভূমিহীন পরিবারের সংখ্যা কম এবং বৈষম্যের মাত্রাও ৩-৪ শতাংশ কম। দশকের পর দশক ধরে চলা ভূমি সংস্কার এবং আধুনিকীকরণও এই ঐতিহাসিক বৈষম্য পুরোপুরি মুছে ফেলতে পারেনি।
জমির এই অসম বণ্টনের পেছনে ভারতের জাতিভেদ প্রথা বা জাতপাতভিত্তিক বৈষম্যও একটি বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বিশেষ করে তফশিলি জাতিভুক্ত মানুষের বসতি যেসব এলাকায় বেশি, সেখানে জমির মালিকানায় বৈষম্যও বেশি লক্ষ্য করা গেছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রান্তিক এই জনগোষ্ঠীকে জমির অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে, যার ফলে তারা আজও অল্প মজুরির কৃষি শ্রমিকের কাজেই সীমাবদ্ধ থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। এছাড়া বাজার বা হাইওয়ের নিকটবর্তী এলাকায় জমির দাম বেশি হওয়ায় ধনীরা সেসব জমি দখল করে নিয়েছে, যা পরোক্ষভাবে বৈষম্যকে আরও উসকে দিয়েছে। তবে আশার কথা হলো, যেসব এলাকায় অর্থনীতি কেবল কৃষির ওপর নির্ভরশীল নয় এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে, সেখানে এই বৈষম্যের মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম। গবেষকদের মতে, কেবল অর্থনৈতিক বৃদ্ধি দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন ভূমি সংস্কারের প্রকৃত বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক ও শ্রেণি বৈষম্য দূর করার সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ।
















