আজকাল ওয়েবডেস্ক: বুধবার সকালে মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী অজিত পওয়ারের মৃত্যু হয়েছে এক মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনায়। মুম্বই থেকে বারামতী যাওয়ার পথে তাঁর ব্যক্তিগত জেটটি অবতরণের সময় ভেঙে পড়ে এবং সঙ্গে সঙ্গেই আগুন ধরে যায়। দুর্ঘটনায় অজিত পওয়ার-সহ বিমানে থাকা মোট পাঁচ জনেরই মৃত্যু হয়েছে। মাত্র ৩৩ মিনিটের একটি যাত্রা শেষ হয়ে যায় ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে।
সকাল ৮টা ১০ মিনিট নাগাদ মুম্বই বিমানবন্দর থেকে উড়েছিল লিয়ারজেট-৪৫ মডেলের ওই ছোট আকারের ব্যক্তিগত বিমানটি। অজিত পওয়ার বারামতীতে তাঁর রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। সকাল ৮টা ৪৩ মিনিট নাগাদ বারামতী বিমানবন্দরের ১১ নম্বর রানওয়ের ধারে বিমানটি আছড়ে পড়ে। মাটিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই তীব্র আগুন ধরে যায় বিমানে। আগুনের ভয়াবহতায় কেউ বাঁচেননি। পরে হাতঘড়ি ও পোশাকের সূত্রে অজিত পওয়ারের দেহ শনাক্ত করা হয়, কারণ দেহগুলি এতটাই পুড়ে গিয়েছিল যে প্রথমে আলাদা করে চেনা সম্ভব হয়নি।
প্রাথমিক তদন্তে এখনও পর্যন্ত বিমানে কোনও যান্ত্রিক ত্রুটি ধরা পড়েনি। তবে দুর্ঘটনার সময় বারামতী বিমানবন্দর ও সংলগ্ন এলাকায় ঘন কুয়াশা ছিল বলে জানা যাচ্ছে। সেই কারণে দৃশ্যমানতা কমে গিয়েছিল। কেন্দ্রীয় অসামরিক বিমান পরিবহণমন্ত্রী কে রামমোহন নায়ডু জানিয়েছেন, অবতরণের সময় দৃশ্যমানতা কম থাকার বিষয়টি তদন্তে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। ডিজিসিএ এবং বিমান দুর্ঘটনার তদন্তকারী সংস্থা এএআইবি ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু করেছে।
উড়ান সংক্রান্ত তথ্য বলছে, যাত্রার প্রথম দিকে সব কিছুই স্বাভাবিক ছিল। ১০ মিনিটের মধ্যেই বিমানটি প্রায় ছ’কিলোমিটার উচ্চতায় পৌঁছে যায় এবং তার গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ১০৩৬ কিলোমিটার। উড়ানের ২৪ মিনিট পর কিছু সময়ের জন্য বিমানটি নজরদারি সঙ্কেত পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছিল। কয়েক মিনিট পরে আবার সেই সঙ্কেত ফিরে এলেও সকাল ৮টা ৪৩ মিনিটে বিমানটি পুরোপুরি নিশ্চুপ হয়ে যায়। ওই সময়েই দুর্ঘটনাটি ঘটে বলে মনে করা হচ্ছে। ভেঙে পড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে বিমানের উচ্চতা নেমে এসেছিল প্রায় ১০১৬ মিটারে এবং গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ২৩৭ কিলোমিটার, যা অবতরণের সময় স্বাভাবিক বলে ধরা হয়।
তদন্তে উঠে এসেছে, বিমানটি এক বার নয়, দু’বার অবতরণের চেষ্টা করেছিল। প্রথম বারের চেষ্টায় পাইলটেরা এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোলকে জানান, তাঁরা রানওয়ে দেখতে পাচ্ছেন না। সেই কারণে বিমানটিকে আকাশে এক বার চক্কর কাটাতে বলা হয়। দ্বিতীয় বার অবতরণের আগে এটিসি ফের জানতে চায়, রানওয়ে দেখা যাচ্ছে কি না। ককপিট থেকে প্রথমে জানানো হয়, রানওয়ে দেখা যাচ্ছে না। কয়েক সেকেন্ড পরেই আবার বলা হয়, রানওয়ে দেখা যাচ্ছে। এই তথ্যের ভিত্তিতেই এটিসি অবতরণের অনুমতি দেয়।
কিন্তু ওই অনুমতির কোনও উত্তর ককপিট থেকে আর পাওয়া যায়নি। ঠিক তার পরের মুহূর্তেই রানওয়ের ধারে আগুন দেখা যায়। সকাল ৮টা ৪৪ মিনিট নাগাদ এটিসি-র সঙ্গে বিমানের সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
কেন্দ্রীয় অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রক পরে জানায়, সকাল ৮টা ১৮ মিনিটে প্রথম বার বারামতীর সঙ্গে যোগাযোগ করে বিমানটি। দ্বিতীয় বার যোগাযোগ হয় বিমানবন্দর থেকে প্রায় ৩০ নটিক্যাল মাইল দূরে থাকাকালীন। তখন পাইলটদের ‘ভিজ়্যুয়াল মিটিওরজিক্যাল কন্ডিশন’ অনুযায়ী নামার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। পাইলটেরা হাওয়ার গতি ও দৃশ্যমানতা সম্পর্কে জানতে চাইলে জানানো হয়, বাতাস স্বাভাবিক এবং দৃশ্যমানতা প্রায় ৩ হাজার মিটার। তবু শেষ পর্যন্ত তাঁরা প্রথম চেষ্টায় রানওয়ে দেখতে পাননি।
বিমানটির ককপিটে ছিলেন দু’জন পাইলট। ক্যাপ্টেন সুমিত কুমারের উড়ানের অভিজ্ঞতা ছিল প্রায় ১৫ হাজার ঘণ্টা। সহ-পাইলট শম্ভবী পাঠকের উড়ানের অভিজ্ঞতা ছিল প্রায় ১৫০০ ঘণ্টা। অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও কেন দ্বিতীয় বারের চেষ্টায় বিমানটি ভেঙে পড়ল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তদন্তকারীরা এখন ককপিট ভয়েস রেকর্ডার, ফ্লাইট ডেটা, আবহাওয়ার পরিস্থিতি এবং অবতরণের সময় নেওয়া সিদ্ধান্তগুলি খতিয়ে দেখছেন।
শরদ পওয়ারের ভাইপো, বর্ষীয়ান এনসিপি নেতা অজিত পওয়ারের আকস্মিক মৃত্যু মহারাষ্ট্রের রাজনৈতিক মহলে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে। এক দিকে শোক, অন্য দিকে প্রশ্ন কুয়াশা, দৃশ্যমানতা এবং শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্ত মিলিয়ে কী ভাবে একটি নিয়মিত উড়ান পরিণত হল এত বড় দুর্ঘটনায়, তার উত্তর খুঁজতেই এখন তদন্তকারীরা প্রতিটি সেকেন্ড ধরে ঘটনাটি পুনর্গঠন করার চেষ্টা করছেন।
