আজকাল ওয়েবডেস্ক: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে তাপপ্রবাহ আরও মারাত্মক রূপ নিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বের প্রায় ২০০ কোটি মানুষের কাছে তীব্র গরম থেকে বাঁচার মতো পর্যাপ্ত কোনও ব্যবস্থা নেই। আর এই সঙ্কটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ভারত। যেখানে জনসংখ্যার এক বিশাল অংশ তথাকথিত 'কুলিং পভার্টি'-র শিকার। এমনটাই জানা গিয়েছে সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যম সূত্রে।
বিখ্যাত বিজ্ঞান পত্রিকা 'নেচার সাসটেইনেবিলিটি'-তে প্রকাশিত একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। বিশ্বের ২৮টি দেশের ১০ লক্ষেরও বেশি পরিবারের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখেছেন, কোটি কোটি মানুষ মাঝারি মাপের 'কুলিং পভার্টি'-র মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। একশো কোটি মানুষ সুরক্ষার অভাব সত্ত্বেও নিজেদের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
কিন্তু কী এই 'কুলিং পভার্টি'? সহজভাষায় বলতে গেলে, গরম থেকে বাঁচতে দরিদ্র মানুষদের মধ্যে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোর অভাবকেই 'কুলিং পভার্টি' বলা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল ঘরে একটি এয়ার কন্ডিশনার বা ফ্যান থাকা না থাকার বিষয় নয়। এর পরিধি আরও ব্যাপক। এর মধ্যে রয়েছে— বাড়ির ছাদ ও দেওয়ালের গুণগত মান, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ, বিশুদ্ধ পানীয় জল, স্বাস্থ্য পরিষেবা, তাপপ্রবাহের আগাম তথ্য পাওয়ার সুযোগ এবং বাইরে কাজ করার সময় একটু ছায়ায় জিরিয়ে নেওয়ার জায়গার সহজলভ্যতার মতো বিষয়। এ সমস্ত সুবিধা যাঁরা পাচ্ছেন না, তাঁরাই মূলত 'কুলিং পভার্টি'র শিকার। এর ফলে তাঁরা সহজেই গরমের জন্হিয ট-স্ট্রোক-সহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়া (বিশেষত, ভারত, বাংলাদেশ ও নেপাল) সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল। এর কারণ হিসেবে 'ইউরো-মেডিটেরিয়ান সেন্টার অন ক্লাইমেট চেঞ্জ'-এর প্রধান গবেষক জাকোমো ফালচেত্তা জানান, এই অঞ্চলে একদিকে যেমন তীব্র গরম ও বাতাসে অত্যাধিক আর্দ্রতা থাকে। তেমনই এখানে এক বিশাল অংশের মানুষকে খোলা আকাশের নিচে রোদে পুড়ে কাজ করতে হয়।
শিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রের পরিবেশের ওপর ভিত্তি করে তৈরি 'কুলিং পভার্টি'-র সম্মুখীন দেশের মধ্যে ভারতের স্থান সবার উপরে। দেশের প্রায় ৯৫% মানুষই এমন এলাকায় বসবাস করেন যেখানে এই ধরনের সুরক্ষার চরম অভাব রয়েছে।
জলবায়ু নিয়ে কর্মরত এবং আন্দোলনকারী হারজিৎ সিংয়ের মতে, দক্ষিণ এশিয়া এখন জলবায়ু সঙ্কটের একেবারে প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে। এখানে জলবায়ুর রুদ্ররূপের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্য। ফলে কোটি কোটি দিনমজুর বা বহিরাগত শ্রমিকদের কাছে এসি ঘরে বসে কাজ করার কোনো সুযোগই নেই। পরিসংখ্যান বলছে, ভারতে লক্ষ লক্ষ মানুষ জীবনধারণ করতে এবং অন্নসংস্থান করতে ৪৫ ডিগ্রি ছাড়ানো গরমেও বাইরে কাজ করতে বাধ্য হন।
গবেষকদের মতে, ঘরে ঘরে শুধু এয়ার কন্ডিশনারের ব্যবহার বাড়ানো এই সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী সমাধান নয়। কারণ এতে বিদ্যুৎ খরচ ও বিশ্ব উষ্ণতা আরও বাড়বে। এর পরিবর্তে, বাড়ি তৈরির সময় এমন সামগ্রী ব্যবহার করা যাতে প্রাকৃতিকভাবেই ঘর ঠান্ডা থাকে। পাশাপাশি, বাড়ির ছাদে বিশেষ ধরনের সাদা বা প্রতিফলক রঙ ব্যবহার করা যেতে পারে, যা সূর্যের তাপকে ফিরিয়ে দেয়। এ ছাড়া, শহরে গাছপালার সংখ্যা বাড়ানো এবং সাধারণ মানুষের জন্য সরকারি উদ্যোগে শীতলীকরণ কেন্দ্র তৈরি করা যেতে পারে। তীব্র গরমে যারা বাইরে কাজ করেন, সেইসব শ্রমিকদের জন্য কাজের সময় পুনর্নির্ধারণ করা এবং কাজের মাঝে পর্যাপ্ত জলের ব্যবস্থা রাখার মতো পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।















