আজকাল ওয়েবডেস্ক: ২০২৫–২৬ অর্থবর্ষের কেন্দ্রীয় বাজেট ঘোষণার সময়ই সমালোচনার মুখে পড়েছিল মোদি সরকার। অভিযোগ ছিল—সামাজিক খাতে ব্যয় যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি, বহু গুরুত্বপূর্ণ জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রয়োজনের তুলনায় কম। কিন্তু এবার কেন্দ্রীয় বাজেট ২০২৬–২৭-এর সঙ্গে প্রকাশিত নথি আরও বড় প্রশ্ন তুলে দিল: যেটুকু বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেটুকুও কি আদৌ খরচ করেছে কেন্দ্র?
দ্য ওয়্যার–এর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক চিত্র। সামাজিক খাতের ২০টি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের বাজেট অনুমান (Budget Estimates) ও সংশোধিত হিসেব (Revised Estimates) মিলিয়ে দেখা হয়েছে। ফলাফল বলছে, ২০২৫–২৬ অর্থবর্ষে মাত্র দুটি প্রকল্পে সংশোধিত ব্যয় বাজেট বরাদ্দের চেয়ে বেশি হয়েছে—প্রধানমন্ত্রী গরিব কল্যাণ অন্ন যোজনা এবং মনরেগা (MGNREGA)।
এই তথ্য আরও বিস্ময়কর, কারণ এই দুটি প্রকল্পের মধ্যে একটি—মনরেগা—ইতিমধ্যেই কার্যত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তার বদলে কেন্দ্র সরকার নতুন একটি কর্মসংস্থান প্রকল্প চালু করেছে, যার নাম VB G RAM G Scheme। এই প্রকল্পের জন্য ৯৫,৬৯২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কিন্তু অধিকারকর্মীদের মতে, নতুন প্রকল্পটি মনরেগার থেকে মৌলিকভাবে আলাদা। এটি আর সার্বজনীন অধিকারভিত্তিক প্রকল্প নয়; বরং কোন এলাকায় প্রকল্প কার্যকর হবে, তা ‘নোটিফাই’ করার ক্ষমতা পুরোপুরি কেন্দ্র সরকারের হাতে।

বিরোধী দলশাসিত রাজ্যগুলির সঙ্গে মোদি সরকারের সম্পর্ক যে দীর্ঘদিন ধরেই টানাপোড়েনের, সেই প্রেক্ষিতে এই পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করেছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় কিছু রাজ্য বা অঞ্চল এই প্রকল্পের বাইরে পড়ে যেতে পারে।
অর্থনীতিবিদ ও নীতিবিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, মোদি সরকারের আমলে সামাজিক খাতে ব্যয় অগ্রাধিকার পাচ্ছে না। ২০২৬–২৭-এর কেন্দ্রীয় বাজেট সেই প্রবণতা শুধু বজায় রাখেনি, বরং তা আরও গভীর হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। বহু প্রকল্পে বাজেট বরাদ্দ ও বাস্তব ব্যয়ের মধ্যে বিশাল ফারাক ধরা পড়েছে।
২০টি প্রকল্পের মধ্যে একমাত্র পিএম-কিসান প্রকল্পে বাজেট অনুমান ও সংশোধিত হিসেব পুরোপুরি মিলে গেছে। কিন্তু বাকি ১৭টি প্রকল্পেই সরকার শেষ পর্যন্ত সেই টাকা পাঠায়নি, যা পাঠানোর কথা বলেছিল। কয়েকটি ক্ষেত্রে এই ফারাক এতটাই বড় যে তা দেশের চলমান অবকাঠামোগত সংকটগুলোর দিকেই ইঙ্গিত করে।
এর অন্যতম উদাহরণ জল জীবন মিশন। ২০১৯ সালে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উদ্যোগে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল—দেশের প্রতিটি গ্রামীণ পরিবারে নিরাপদ পানীয় জলের ট্যাপ সংযোগ পৌঁছে দেওয়া। ২০২৫–২৬ অর্থবর্ষে এই প্রকল্পে ৬৭,০০০ কোটি টাকা খরচ করার কথা ছিল। কিন্তু সংশোধিত হিসেব বলছে, বাস্তবে খরচ হয়েছে মাত্র ১৭,০০০ কোটি টাকা। সম্প্রতি ইন্দোরে পানীয় জল সংক্রান্ত যে সঙ্কট দেখা গেছে, তা আবারও প্রমাণ করেছে নিরাপদ ট্যাপ জলের গুরুত্ব কতটা। অথচ কেন্দ্রীয় ব্যয়ের অগ্রাধিকারে এই প্রকল্প যে ছিল না, সংখ্যাই তার প্রমাণ দিচ্ছে।
আবাসন ক্ষেত্রেও একই ছবি। গ্রামীণ ও শহুরে—দু’ধরনের প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনাতেই প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের মধ্যে বড় ব্যবধান দেখা গেছে। ২০২৪ সালে সরকার PMAY-Urban 2.0 চালু করলেও তাতেও ব্যয়ের ঘাটতি রয়ে গেছে। PMAY-Urban–এ বাজেট বরাদ্দের তুলনায় খরচ কম হয়েছে ১৯,৭৯৪ কোটি টাকা, PMAY-Urban 2.0–এ ৩,২০০ কোটি টাকা এবং PMAY-Rural–এ ২২,৩৩২ কোটি টাকা।
এই প্রবণতা যে অর্থনীতিবিদদের নজর এড়িয়েছে, তা নয়। জয়তী ঘোষ ও সি.পি. চন্দ্রশেখরের মতো বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন, গত কয়েক দশকে ভারতে সামাজিক খাতে যে ব্যয় বৃদ্ধি দেখা গেছে, তার বড় অংশই এসেছে রাজ্য সরকারগুলোর হাত ধরে—কেন্দ্র থেকে প্রাপ্য অর্থের অংশ কমতে থাকা সত্ত্বেও।
মোদি সরকার জনকল্যাণে নিজেদের দায়বদ্ধতা নিয়ে যতই দাবি করুক না কেন, ২০২৬–২৭ বাজেটের সঙ্গে প্রকাশিত এই সংখ্যাগুলো সেই দাবিকে গভীর প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। কাগজে-কলমে প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবে খরচ—এই দুইয়ের ব্যবধান ক্রমশই সামাজিক খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
