আজকাল ওয়েবডেস্ক: সমাজ বিজ্ঞানের পাঠ্য বইয়ে থাকা ‘বিচারব্যবস্থায় দুর্নীতি’ প্রসঙ্গ ঘিরে তীব্র বিতর্কের জেরে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত কঠোর পদক্ষেপ নিল। বৃহস্পতিবার এক শুনানিতে শীর্ষ আদালত অষ্টম শ্রেণির নতুন এনসিইআরটি বইটি দেশে-বিদেশে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং বাজারে থাকা সব কপি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেয়। পাশাপাশি অনলাইনে পুরো বই বা আংশিক অংশ শেয়ার করার উপরও নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে।
২০২৬ সালের অষ্টম শ্রেণির এনসিইআরটি (NCERT) নির্দেশিত অষ্টম শ্রেণির নতুন সমাজ বিজ্ঞানের (Social Science) পাঠ্য বইয়ে দেশীয় বিচারব্যবস্থায় দুর্নীতির প্রসঙ্গ যুক্ত করা হয়। 'দ্য রোল অফ দ্য জুডিশিয়ারি ইন আওয়ার সোসাইটি' শীর্ষক এই নতুন অধ্যায়টিতে বিপুল সংখ্যক নিষ্পত্তি না-হওয়া মামলার মতো নানান প্রসঙ্গের পাশাপাশি বিচারব্যবস্থার দুর্নীতিজনিত প্রতিকূলতার উল্লেখও পাওয়া যায়। শুধু দেশের বিচার ব্যাবস্থার কাঠামো ও কার্য্যপ্রণালী নয়, ছাত্র-ছাত্রীরা জানবে এবারে দুর্নীতি নিয়েও।
বিষয়টি চাঞ্চল্য সৃষ্টি করলে শীর্ষ আদালত নিজের কর্তব্য পালন করবেন বলে জানিয়েছিলেন। আদালতে সিনিয়র বিচারপতি কপিল সিব্বাল বলেন, স্কুলের পাঠ্যবইয়ে ‘বিচারবিভাগীয় দুর্নীতি’ অন্তর্ভুক্ত করা “অত্যন্ত বিরক্তিকর” ঘটনা। তাঁর মতে, অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের এমন বিষয় পড়ানো বিচারবিভাগের মর্যাদাকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। আদালতের বেঞ্চের নেতৃত্বে ছিলেন প্রধান বিচারপতি সূর্য্য কান্ত। শুনানির সময় তিনি জানান, “আমরা কাউকে আমাদের প্রতিষ্ঠানের দিকে আঙুল তুলতে দেব না। কাউকে কলঙ্কিত করতে দেব না। গভীর তদন্ত দরকার। কে দায়ী, তা জানতে হবে। মাথাদের ধরে বের করে আনতেই হবে।”
শুনানিতে কেন্দ্র পক্ষের সলিসিটার জেনারেল তুষার মেহেতা জানান, সংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তিকে আর কোনও মন্ত্রকের সঙ্গে কাজ করতে দেওয়া হবে না। তিনি এও বলেন, “আমরা প্রতিষ্ঠানের পাশে আছি। কেউ পাড় পাবে না।” কিন্তু প্রধান বিচারপতি তাতে সন্তুষ্ট হননি। তাঁর মতে, এই ঘটনা “গভীর ষড়যন্ত্র” এবং “পরিকল্পিত পদক্ষেপ”। তাঁর কথায়, “এর ফলে কী হল? একটা পরিকল্পিত গুলি এসে বিচারব্যবস্থাকে রক্তাক্ত করে দিয়ে চলে গেল।” প্রধান বিচারপতি আরও বলেন, বইটি এখনও বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। যদিও সলিসিটার জেনারেল দাবি করেন, ৩২টি বই বাজারে গেলেও সেগুলি প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং পুরো অধ্যায়টি সংশোধন করা হবে।
আদালত এনসিইআরটি-র একটি প্রেস বিবৃতিরও সমালোচনা করে। সেখানে বলা হয়েছিল, “অনুপযুক্ত লেখা অনিচ্ছাকৃতভাবে ঢুকে পড়েছিল” এবং “বিচারবোধের ভুলের জন্য আমরা দুঃখিত।” কিন্তু আদালতের মতে, এতে স্পষ্ট ক্ষমাপ্রার্থনা ছিল না। এনসিইআরটি এই বই প্রকাশ করায় সংস্থার চেয়ারম্যান দীনেশ প্রসাদ সক্লানিকেও নোটিস পাঠানো হয়েছে। সরকারি সূত্রে জানানো হয়, ‘বিচারব্যবস্থায় দুর্নীতি’ প্রসঙ্গটি মুছে ফেলা হবে।
সিনিয়র আইনজীবী সিদ্ধার্থ লুঠরার কথায়, “অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কাছে শাসনব্যবস্থার অঙ্গগুলিকে সহজভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়াই উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। অতিরিক্ত জটিলতা তৈরি করা ঠিক নয়।” অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী প্রয়াগ পারিজাত সিং বলেন, “বিচারব্যবস্থায় দুর্নীতির উল্লেখ যদি সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ ছাড়া করা হয়, তবে তা ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বোধের ঘাটতি প্রকাশ করবে। বিচারব্যবস্থা সব সময় আইন উন্নত করার চেষ্টা করেছে এবং ভারতীয় গণতন্ত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে—সেই প্রেক্ষাপটও তুলে ধরা দরকার ছিল।”
এই ঘটনার পর বিচারপতি মহলে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে। সর্বোচ্চ আদালত স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে বিচারব্যবস্থার মর্যাদা ও বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষায় তারা কোনও আপস করবে না। বিষয়টি এখনো বিচারাধীন, এবং আদালত জানিয়েছে—“আমরা এই মামলা বন্ধ করছি না।”
