আজকাল ওয়েবডেস্ক: মহারাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পুর নির্বাচনের ভোটগণনা যত এগোচ্ছে, ততই একের পর এক গুরুতর অভিযোগ ও বিতর্ক সামনে আসছে। ভোটগ্রহণে সহজেই মুছে যায় এমন কালি ব্যবহার, বহু ভোটারের নাম ভোটার তালিকায় না পাওয়া, এবং নগদ অর্থ বিলির অভিযোগ, এই সব মিলিয়ে রাজ্যের অন্যতম বহুল আলোচিত এই নাগরিক নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে।

রাজ্যের ৮৯৩টি ওয়ার্ডে মোট ২,৮৬৯টি আসনের জন্য এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় একদিন আগে। ভোট হয়েছে মুম্বইয়ের বৃহন্মুম্বই মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন (বিএমসি), পুণে, পিম্পরি-চিঞ্চওয়াড়, থানে, কল্যাণ-ডোম্বিভলি, মীরা-ভায়ন্দর-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নগর সংস্থায়। বহু পৌরসভায় দীর্ঘ আট-নয় বছর পর ভোট হওয়ায় এই নির্বাচন ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

তবে এবারের নির্বাচনে শহুরে শাসন, পরিকাঠামো বা নাগরিক পরিষেবার প্রশ্ন অনেকটাই আড়ালে চলে যায়। তার বদলে প্রচারের কেন্দ্রে উঠে আসে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ও রাজনৈতিক মেরুকরণের রাজনীতি। পাশাপাশি, কিছু ওয়ার্ডে তথাকথিত আদর্শগত বিভাজন উপেক্ষা করে একে অপরের বিপরীত মেরুর দলগুলির জোটও নজর কেড়েছে।

সবচেয়ে বেশি নজর ছিল দেশের ‘সবচেয়ে ধনী’ পুর সংস্থা বলে পরিচিত বিএমসি নির্বাচনের দিকে। মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বিজেপি নেতৃত্বাধীন মহাযুতি জোট ১০৯ থেকে ১১৬টি ওয়ার্ডে এগিয়ে রয়েছে। বিএমসি দখলের জন্য প্রয়োজন ১১৪টি ওয়ার্ডে সংখ্যাগরিষ্ঠতা। অন্যদিকে, শিবসেনা (উদ্ধব বালাসাহেব ঠাকরে)-মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনা জোট প্রায় ৭০টি ওয়ার্ডে এগিয়ে রয়েছে। কংগ্রেস এগিয়ে আছে ১৩টি ওয়ার্ডে।

ভোটগ্রহণের দিন থেকেই বিতর্ক শুরু হয়। দ্য ওয়্যার-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, বৃহন্মুম্বই মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন নির্বাচনে বহু ভোটার অভিযোগ করেন, তাঁদের আঙুলে প্রচলিত কালি না লাগিয়ে মার্কার পেন ব্যবহার করা হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে দেখা যায়, স্যানিটাইজার বা নেলপলিশ রিমুভার দিয়ে সহজেই সেই দাগ মুছে ফেলা যাচ্ছে। বিরোধী দলগুলি একে সরাসরি ভোট জালিয়াতির সম্ভাবনা বলে দাবি করে।

প্রথমে অভিযোগ উড়িয়ে দিলেও, পরে চাপ বাড়ায় রাজ্যের নির্বাচন কমিশনার দীনেশ ওয়াঘমারে অবস্থান বদলাতে বাধ্য হন। তিনি কালি বা মার্কারের গুণগত মান, বিশেষ করে তাতে সিলভার নাইট্রেটের পরিমাণ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেন এবং কালি সরবরাহকারী সংস্থা কোরেস-এর কাছ থেকে ব্যাখ্যা চান। মিড-ডে-কে দেওয়া বিবৃতিতে তিনি জানান, কালি সংগ্রহ সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য তখনই পাওয়া যায়নি। বিরোধী শিবির একে ‘গণতন্ত্রের উপর আঘাত’ বলে আখ্যা দেয়। অন্যদিকে বিজেপি ও মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিস এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন।

এই প্রসঙ্গে মিড-ডে-র প্রতিবেদন শেয়ার করে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী এক্স-এ লেখেন, “নির্বাচন কমিশন নাগরিকদের গ্যাসলাইট করছে, এভাবেই আমাদের গণতন্ত্রের উপর থেকে মানুষের আস্থা উঠে যাচ্ছে। ভোট চুরি একটি দেশবিরোধী কাজ।”

এর মধ্যেই নগদ অর্থ বিলির অভিযোগ নতুন করে বিতর্ক উসকে দেয়। ইন্ডিয়া টুডে-র একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বিভিন্ন এলাকায় দলীয় কর্মীরা ভোটের আগে বাড়ি বাড়ি গিয়ে টাকা বিলি করেছেন। নিউ পানভেলের এক বাসিন্দার বক্তব্য উদ্ধৃত করে রিপোর্টে বলা হয়, “দু’জন লোক এসে দরজায় কড়া নাড়ে। আমার স্বামীর নাম নিয়ে বলে, ১৫ জানুয়ারির পৌরসভা ভোটের জন্য টাকা দিতে এসেছে।” পরে প্রতিবেশীদের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, প্রতিটি পরিবারকে ২,০০০ টাকা করে দেওয়া হচ্ছিল বলে অভিযোগ।

এদিকে, ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টির নেতা অনীশ গাওয়ান্ডে সোশ্যাল মিডিয়ায় অভিযোগ করেন, সারা মহারাষ্ট্র জুড়েই বহু ভোটার তাঁদের নাম ভোটার তালিকায় খুঁজে পাননি। কোথাও কোথাও অনলাইন ওয়েবসাইটও কাজ করছিল না বলে অভিযোগ ওঠে। সংবাদসংস্থা-কে এক ভোটার বলেন, “ইন্টারনেটে যে নম্বর দেখাচ্ছে, এখানে তা মিলছে না। এটা সম্পূর্ণ প্রশাসনিক ব্যর্থতা। আমি ভোট না দিয়েই ফিরতে বাধ্য হচ্ছি।”

ভোটগণনার মাঝেই এই সব অভিযোগ সামনে আসায় মহারাষ্ট্রের নাগরিক নির্বাচন কেবল রাজনৈতিক ফলাফলের জন্য নয়, বরং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও এক গভীর প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে।