আজকাল ওয়েবডেস্ক: মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা আইন (এমজিএনরেগা) বাতিল করে নতুন আইন চালু করার বিরুদ্ধে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের ওপর দরিদ্র-বিরোধী নীতির অভিযোগ তুলল কংগ্রেস। দিল্লির আকবর রোডে অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির (এআইসিসি) সদর দপ্তরের সামনে দলের নেতা-কর্মীরা জড়ো হয়ে তীব্র প্রতিবাদে শামিল হন।
প্রতিবাদ সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে দিল্লি প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির (ডিপিসিসি) সভাপতি ধর্মেন্দ্র যাদব বলেন, কেন্দ্রের বর্তমান পদক্ষেপ আসলে গরিব মানুষের ওপর “নিরবচ্ছিন্ন আক্রমণ”। তাঁর অভিযোগ, আইনের মাধ্যমে যে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল, তা পরিকল্পিতভাবে তুলে নেওয়া হচ্ছে।
“এই সরকার দেশের সবচেয়ে গরিব মানুষদের লক্ষ্য করে একের পর এক আঘাত হানছে। যাদের আইনি অধিকার ছিল কাজ পাওয়ার, আজ সেই অধিকারই ধীরে ধীরে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। যে ব্যবস্থাগুলি গরিব মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কথা ছিল, সেগুলিকেই ভেঙে ফেলা হচ্ছে,” বলেন যাদব।
তিনি দলীয় কর্মীদের উদ্দেশ্যে আহ্বান জানান, আন্দোলন দীর্ঘমেয়াদি হবে ধরে নিয়ে শৃঙ্খলা ও দৃঢ়তা বজায় রাখতে। “এটা একদিনের লড়াই নয়। এটা দীর্ঘ সংগ্রাম। সরকারকে নতজানু করতে হলে আমাদের অবিচল থাকতে হবে,” বলেন তিনি।
এই প্রতিবাদ কর্মসূচি কংগ্রেসের ৪৫ দিনের দেশব্যাপী আন্দোলন ‘এমজিএনরেগা বাঁচাও সংগ্রাম যাত্রা’-র অংশ। কেন্দ্রের নতুন গ্রামীণ কর্মসংস্থান আইন— ‘বিকশিত ভারত গ্যারান্টি ফর রোজগার অ্যান্ড আজীবিকা মিশন (গ্রামীন) আইন, ২০২৫’ বা VB-G RAM G আইন—এর বিরোধিতায় এই আন্দোলন শুরু করেছে কংগ্রেস। দলটির স্পষ্ট দাবি, নতুন আইন বাতিল করে এমজিএনরেগার পুরনো কাঠামো ফিরিয়ে আনতে হবে।
প্রতিবাদে উপস্থিত ছিলেন কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক ও রাজ্যসভার সাংসদ জয়রাম রমেশ। তিনি বলেন, এমজিএনরেগা কোনও সাধারণ কল্যাণমূলক প্রকল্প নয়, এটি ছিল একটি অধিকারভিত্তিক ঐতিহাসিক আইন, যা গ্রামীণ পরিবারের জন্য কাজ পাওয়ার আইনি নিশ্চয়তা দিয়েছিল। নতুন আইনের মাধ্যমে সেই অধিকারকেই ফাঁপা করে দেওয়া হয়েছে বলে তাঁর অভিযোগ।
“এমজিএনরেগা লক্ষ লক্ষ পরিবারের হাতে আইনি অধিকার তুলে দিয়েছিল—কাজের অধিকার। বর্তমান সরকার সেই অধিকারের ভিত্তিটাই দুর্বল করে দিচ্ছে,” বলেন রমেশ। তাঁর মতে, VB-G RAM G আইন ইউপিএ আমলের এই ঐতিহাসিক আইনের মূল ভাবনা ও উদ্দেশ্যকে ক্ষুণ্ণ করেছে।
এমজিএনরেগার ইতিহাস স্মরণ করে জয়রাম রমেশ বলেন, ২০০৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি অন্ধ্রপ্রদেশের অনন্তপুর জেলার একটি গ্রাম থেকে এই আইন চালু হয়েছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, জাতীয় উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ারপার্সন সোনিয়া গান্ধী এবং কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী—এই তিনজনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল এই আইনের পেছনে।
রমেশের দাবি, এমজিএনরেগা গ্রামীণ ভারতের চেহারা বদলে দিয়েছিল। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ পরিবার কাজ ও জীবিকা সুরক্ষা পেয়েছে এই আইনের মাধ্যমে। বিশেষ করে ভূমিহীন পরিবার, দলিত, আদিবাসী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও মহিলারা এই প্রকল্পে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়েছেন। পাশাপাশি পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে মজুরি দেওয়ার মতো ব্যবস্থারও পথপ্রদর্শক ছিল এই আইন।
প্রতিবাদ চলাকালীন কংগ্রেস কর্মীদের মুখে শোনা যায় স্লোগান—“এমজিএনরেগা চোর, গদি ছাড়ো”—যার মাধ্যমে সরকারকে গ্রামীণ ভারতের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে বিদ্ধ করা হয়।
উল্লেখ্য, তীব্র বিরোধিতা ও সংসদে উত্তেজনার মধ্যেই VB-G RAM G আইন পাস হয় এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে রাষ্ট্রপতির সম্মতি পায়। প্রায় দুই দশক পর কার্যত এমজিএনরেগার জায়গা নেয় এই নতুন আইন।
সরকারের দাবি, নতুন আইনে গ্রামীণ পরিবারের জন্য বছরে কাজের নিশ্চয়তা ১০০ দিন থেকে বাড়িয়ে ১২৫ দিন করা হয়েছে। তবে বিরোধীদের বক্তব্য, টাকা দেওয়ার পদ্ধতি, পরিকল্পনা কাঠামো ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় যে পরিবর্তন আনা হয়েছে, তাতে এমজিএনরেগার অধিকারভিত্তিক চরিত্রটাই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বহু রাজ্য সরকার ও বিরোধী দলগুলির অভিযোগ, নতুন আইনের মাধ্যমে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ হচ্ছে, রাজ্যগুলির ওপর আর্থিক চাপ বাড়ছে এবং কাজ পাওয়ার আইনি অধিকার দুর্বল হয়ে পড়ছে।
এই প্রেক্ষাপটে কংগ্রেস জানিয়েছে, আগামী দিনে আন্দোলন আরও জোরদার করা হবে। দলের মতে, গ্রামীণ কর্মসংস্থানের এই লড়াই আসলে দেশের সবচেয়ে গরিব মানুষের সংবিধানস্বীকৃত অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার লড়াই।
