আবু হায়াত বিশ্বাস, দিল্লি: সংসদের অধিবেশন বসছে আগামী ১৬ এপ্রিল। তার আগে বিরোধীদের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হতে চলেছে রাজধানী দিল্লিতে। জানা গিয়েছে, ১৫ এপ্রিল বিরোধী শিবিরের এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। ওই বৈঠকে ভার্চুয়াল নয়, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির নেতারা সশরীরে উপস্থিত থাকবেন। শুক্রবার কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক হয়েছে। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চলা বৈঠকে আসন্ন সংসদ অধিবেশনে দলের রণকৌশল কী হবে, তা নিয়ে বিস্তারিত আলচোনা হয়েছে। মহিলা সংরক্ষণ আইন, আসন পুনর্বিন্যাস ও পশ্চিম এশিয়া সঙ্কট নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকের পর কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ অভিযোগ করেন, বাংলা ও তামিলনাড়ু ভোটের আগে মহিলা সংরক্ষণ আইন নিয়ে কৃতিত্ব নেওয়ার চেষ্টা করছেন প্রধানমন্ত্রী। অথচ এটি ২০২৩ সালে সংসদে সর্বসম্মতিতে পাশ হয়েছে। ১৬ থেকে ১৮ এপ্রিল সংসদ অধিবেশন বসার কথা তবে কংগ্রেস অভিযোগ করেছে, এখনও সরকারিভাবে তাদের জানানো হয়নি, আসন্ন অধিবেশনে সংবিধানের কোন কোন অনুচ্ছেদে সংশোধন করা হবে।
মহিলা সংরক্ষণ আইন কার্যকর করতে কেন্দ্রের প্রস্তাবিত সীমানা পুনর্বিন্যাস পরিকল্পনা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে। তিনি সতর্ক করে বলেন, “এই পদক্ষেপের ‘গুরুতর পরিণতি’ হতে পারে এবং বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা জরুরি।” কংগ্রেস সভাপতির আরও অভিযোগ,
“সরকার অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে সংবিধান সংশোধনী বিল পাশ করাতে চাইছে, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পরিপন্থী।” তাঁর মতে, “এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যথেষ্ট আলোচনা ও সর্বসম্মতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।”
উল্লেখ্য, মহিলা সংরক্ষণ আইন বাস্তবায়নের জন্য ডিলিমিটেশন বা নির্বাচনী আসন পুনর্বিন্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এদিন জয়রাম রমেশ জানান, “আমাদের দাবি ছিল যে পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনের (২৯ এপ্রিলের)পর একটি সর্বদলীয় সভা ডাকা হোক। সেখানে সংবিধান সংশোধনী বিল নিয়ে আলোচনা করা হোক এবং ঐকমত্য তৈরির চেষ্টা করা হোক। তাছাড়া, পাঁচটি রাজ্যে নির্বাচনের সময় এই বিশেষ অধিবেশন ডাকা উচিত নয়, কারণ এটি আচরণবিধি লঙ্ঘন করবে।”
এদিন কংগ্রেস অভিযোগ করেছে, মহিলা সংরক্ষণ আইন বাস্তবায়ন নিয়ে মোদি সরকারের ‘ইউ-টার্ন’ আসলে শাসন ব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং বিদেশনীতি নিয়ে ধাক্কা ঢাকার চেষ্টা। দলের মতে, ভারতের মহিলাদের কাছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ক্ষমা চাওয়া উচিত।
জয়রাম বলেন, “২০২৩ সালে সংসদে সর্বসম্মতভাবে পাশ হওয়া ‘নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম’ ২০২৪ সালের নির্বাচন থেকেই কার্যকর করার দাবি করেছিল কংগ্রেস। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সেটিকে জনগণনা ও সীমানা পুনর্নির্ধারণ (ডিলিমিটেশন)-এর সঙ্গে যুক্ত করে বিলম্বিত করেন।”
রমেশের দাবি, এখন বিধানসভা নির্বাচনে সম্ভাব্য পরাজয়ের মুখে পড়ে সরকার অবস্থান বদল করেছে। তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী এখন চাইছেন মানুষ যেন জনগণনা ও ডিলিমিটেশন প্রসঙ্গ ভুলে যায়। অথচ, সরকারি তথ্য অনুযায়ী ২০২৭ সালের মধ্যেই জনগণনার ফল প্রকাশ সম্ভব।” কংগ্রেস নেতার বক্তব্য, “মোদি সরকারের এই অবস্থান পরিবর্তন পরিকল্পনার অভাব এবং বিরোধীদের সঙ্গে আলোচনায় অনীহা প্রকাশ করে। একইসঙ্গে, বিজেপির কাছে তামিলনাড়ু ও পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে অন্য কোনও শক্তিশালী ইস্যু নেই। ওই দুই রাজ্যে ভোটের আগে মহিলা সংরক্ষণ আইন নিয়ে কৃতিত্ব নেওয়ার চেষ্টা করছেন মোদি।”
উল্লেখ্য, বর্তমান আইনে লোকসভা ও বিধানসভায় ৩৩ শতাংশ আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষণের বিধান থাকলেও, তা কার্যকর হবে জনগণনা ও ডিলিমিটেশন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে তা ২০৩৪ সালের আগে কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে সরকার এখন আইন সংশোধন করে ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগেই তা কার্যকর করার পরিকল্পনা করছে। এর জন্য ১৬ থেকে ১৮ এপ্রিল সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডাকা হয়েছে।
সম্ভাব্য পুনর্বিন্যাস নিয়ে কংগ্রেসের আশঙ্কা, দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। বিশেষ করে দক্ষিণ ভারত, উত্তর-পূর্ব ও তুলনামূলক ছোট রাজ্যগুলির প্রতিনিধিত্ব কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। রমেশের দাবি, উত্তরপ্রদেশের মতো জনবহুল রাজ্যের আসন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও কেরল-সহ ছোট রাজ্যগুলি তেমন সুবিধা পাবে না, ফলে আঞ্চলিক বৈষম্য আরও বাড়বে। কেরলে এখন লোকসভার আসন সংখ্যা ২০। আসন পুনর্বিন্যাস হলে তা ৩০ হবে। উত্তরপ্রদেশে এখন ৮০ আসন। সেই সংখ্যা বেড়ে আসন হবে ১২০টি। বড় ফারাক তৈরি হবে। অন্যদিকে, এখন পশ্চিমবঙ্গের লোকসভা আসন ৪২টি। উত্তরপ্রদেশের ৮০টি। ৩৮টির ফারাক। আসন পুনর্বিন্যাস হলে পশ্চিমবঙ্গের লোকসভা আসন বেড়ে ৬৩টি হবে। উত্তরপ্রদেশে আসন হবে ১২০টি। ফলে তখন দুই রাজ্যের ফারাক হবে ৫৭টি আসনের।
ভোটের মুখে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন বৃহস্পতিবার এক দীর্ঘ পোস্টে লেখেন, “এটি আসন পুনর্বিন্যাস নয়, ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস।” তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, “এই প্রস্তাব বিজেপি সরকারেরই স্লোগান ‘ন্যূনতম সরকার সর্বোচ্চ প্রশাসন’-এর পরিপন্থী।”















