আজকাল ওয়েবডেস্ক: শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ঘিরে আক্রমণ আরও তীব্র করল কংগ্রেস। দলটির অভিযোগ, তাঁর প্রত্যক্ষ মদতেই বারাণসীর মনিকর্ণিকা ঘাটে শতাব্দী প্রাচীন মন্দির ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ভেঙে ফেলা হচ্ছে। অবিলম্বে এই কাজ বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে কংগ্রেস।
হিন্দুধর্মে মনিকর্ণিকা ঘাট শুধু একটি শ্মশান ক্ষেত্র নয়, এটি মোক্ষলাভের পবিত্র স্থান হিসেবে বিশ্বাস করা হয়। জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রতীকে পরিণত এই ঘাটের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শতাব্দীর পর শতাব্দীর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্মৃতি। সেই কারণেই এখানকার যেকোনও রকম পুনর্গঠন বা উন্নয়ন কাজ স্থানীয় ধর্মগুরু ও কাশীর পুরোহিত সমাজের সঙ্গে আলোচনা করেই হওয়া উচিত বলে দাবি কংগ্রেসের। উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেই বারাণসীর সাংসদ।
উত্তরপ্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অজয় রাই, যিনি বারাণসীরই বাসিন্দা, বিজেপি সরকারের ‘ধর্মভণ্ডামি’ প্রকাশ্যে এনেছেন বলে দাবি করেন। তাঁর বক্তব্য, “আমরা সাধারণ মানুষের পাশে আছি এবং এই সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করব। যোগী ও মোদি সরকার মুখে হিন্দুত্বের কথা বলে, কিন্তু বাস্তবে তারা সম্পূর্ণ নাস্তিক। ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করাই তাদের রাজনীতি।”
২০১৯ এবং ২০২৪- দু’বারই বারাণসী লোকসভা কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন অজয় রাই। তাঁর অভিযোগ আরও কড়া, “মন্দির ভাঙাই নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক উত্তরাধিকার।” গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় রাস্তা চওড়া করা ও শহর সাজানোর নামে একাধিক মন্দির ভাঙা হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন। সেই সময় বিশ্ব হিন্দু পরিষদের তৎকালীন নেতা অশোক সিংহালও এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছিলেন বলেও রাই স্মরণ করিয়ে দেন।
প্রধানমন্ত্রীর বহুল উচ্চারিত “মা গঙ্গা আমাকে ডেকেছে” মন্তব্যকে কটাক্ষ করে অজয় রাই বলেন, গঙ্গায় চলা ক্রুজ জাহাজ থেকে নোংরা জল ও নিকাশি সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। পাশাপাশি তিনি বারাণসীর প্রাচীন শস্য বাজার দালমন্ডি ভাঙার পরিকল্পনা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর কথায়, “দালমন্ডি ধ্বংস করতে বদ্ধপরিকর বিজেপি সরকার। পুনর্বাসনের কোনও পরিকল্পনা নেই, ব্যবসায়ীদের কথাও শোনা হচ্ছে না। দালমন্ডি ভেঙে গেলে লক্ষ লক্ষ মানুষ রুজি হারাবেন, অসংখ্য পরিবার পথে বসবে।”
এর আগের দিনই কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে এবং দলের সাধারণ সম্পাদক প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বঢরা এই ইস্যুতে মোদি সরকারকে নিশানা করেছিলেন। খাড়গের অভিযোগ, ঐতিহাসিক ঐতিহ্য মুছে ফেলে নিজের নামের ফলক লাগাতেই আগ্রহী প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, “গুপ্ত যুগের উল্লেখ পাওয়া মনিকর্ণিকা ঘাট, যা পরে লোকমাতা অহল্যাবাই হোলকর পুনরুদ্ধার করেছিলেন, সেই দুর্লভ প্রাচীন ঐতিহ্য ‘সংস্কারের’ অজুহাতে ধ্বংস করা হয়েছে, এ এক গুরুতর অপরাধ।”
প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বঢরাও সরকারকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন। তাঁর অভিযোগ, উন্নয়নের নামে ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্য ধ্বংস করা হচ্ছে কিছু ব্যক্তির বাণিজ্যিক স্বার্থে। “এটি গুরুতর পাপ। এর আগেও বারাণসীতে সংস্কারের নামে বহু শতাব্দী প্রাচীন মন্দির ভেঙে ফেলা হয়েছে,” বলেন তিনি। কাশীর ধর্মীয়, আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় মুছে দেওয়ার এই ‘চক্রান্ত’ অবিলম্বে বন্ধ করার দাবিও তোলেন প্রিয়াঙ্কা।
এদিকে মনিকর্ণিকা ঘাট পুনর্নির্মাণ প্রকল্পের অধীনে চলা ভাঙচুর ঘিরে স্থানীয় স্তরে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ভাঙচুরের সময় অহল্যাবাই হোলকরের শতাব্দীপ্রাচীন একটি মূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও এই দাবি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে বারাণসী জেলা প্রশাসন। জেলাশাসক সত্যেন্দ্র কুমার বুধবার জানান, সমস্ত প্রত্নবস্তু সংস্কৃতি দপ্তরের তত্ত্বাবধানে সুরক্ষিত রাখা হয়েছে এবং কাজ শেষ হলে সেগুলি আগের রূপেই পুনঃস্থাপন করা হবে। তাঁর দাবি, ঘাটে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া হয়, সেখানে স্যানিটেশন ও জায়গা ব্যবস্থাপনা উন্নত করাই এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য।
সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ জুলাই প্রধানমন্ত্রী নিজে এই পুনর্নির্মাণ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। প্রকল্পের আনুমানিক খরচ ধরা হয়েছে ১৭.৫৬ কোটি টাকা।
মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়া এই প্রতিবাদ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে পাল সমাজ সমিতি। তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে মারাঠি সম্প্রদায়ের একাংশ ও অন্যান্য স্থানীয় সংগঠন। সমিতির নেতা মহেন্দ্র পাল দাবি করেছেন, ভাঙচুরের সময় অহল্যাবাই হোলকরের মূর্তি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। সনাতন রক্ষক দলের সভাপতি অজয় শর্মার অভিযোগ, একাধিক প্রতিষ্ঠিত দেবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা সরাসরি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত।
কাশীর প্রাণকেন্দ্রে এই বিতর্ক ক্রমেই রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক সংঘাতের রূপ নিচ্ছে। উন্নয়ন বনাম ঐতিহ্য- এই টানাপোড়েনের মাঝে মনিকর্ণিকা ঘাট এখন জাতীয় রাজনীতির অন্যতম স্পর্শকাতর ইস্যু হয়ে উঠেছে।
