আজকাল ওয়েবডেস্ক: ২০২৫ সালে ভারতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য ভাবে কমলেও ধর্মভিত্তিক হিংসা ও বৈষম্য আরও গভীর ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে, এমনই দাবি করেছে নাগরিক সমাজ সংগঠন সেন্টার ফর স্টাডি অব সোসাইটি অ্যান্ড সেকুলারিজম (CSSS)। Scroll.in-এ প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে দেশে মোট ২৮টি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটেছে, যেখানে ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৫৯। অর্থাৎ এক বছরে দাঙ্গার ঘটনা প্রায় ৫২ শতাংশ কমেছে। এই দাঙ্গাগুলিতে চার জন নিহত এবং অন্তত ৩৬০ জন আহত হয়েছেন।

তবে দাঙ্গার সংখ্যা কমলেও জনতার হাতে হিংসা বা মব ভায়োলেন্স কমেনি। ২০২৫ সালে মব হিংসার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে ১৪টি, যাতে আট জনের মৃত্যু হয়েছে। আগের বছর ১৩টি ঘটনায় প্রাণ গিয়েছিল ১১ জনের। CSSS-এর মতে, এই পরিসংখ্যান দেখায় যে প্রকাশ্য দাঙ্গা কিছুটা কমলেও পরিচয়ভিত্তিক হিংসা সমাজের ভেতরে অন্য রূপে টিকে রয়েছে।

সংস্থাটির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ এখন আর কেবল রাস্তার দাঙ্গার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মুসলিম ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য, জনপরিসর থেকে তাদের সংস্কৃতির ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া, ঘৃণামূলক ভাষণের বিস্তার এবং হিন্দুত্ববাদী উগ্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কার্যত দায়মুক্তির পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে জনপরিসরে হিন্দু ধর্মীয় উৎসব, প্রতীক ও আচার-অনুশীলনের অতিরিক্ত ও আক্রমণাত্মক উপস্থিতি সংখ্যাগরিষ্ঠ সাংস্কৃতিক আধিপত্যকে আরও জোরদার করছে বলে রিপোর্টে মন্তব্য করা হয়েছে।

রাজ্যভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে মহারাষ্ট্রে মোট সাতটি। পশ্চিমবঙ্গ ও গুজরাটে চারটি করে, মধ্যপ্রদেশে তিনটি এবং উত্তরপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড, অসম ও উত্তরাখণ্ডে দু’টি করে দাঙ্গা ঘটেছে। বিহার ও ওড়িশায় একটি করে ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। মোট দাঙ্গার প্রায় ৪০ শতাংশ ঘটেছে মহারাষ্ট্র ও গুজরাটে। পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিতে হয়েছে ৩৭ শতাংশ এবং উত্তর ভারতে ২৫ শতাংশ দাঙ্গা। দক্ষিণ ভারতে কোনও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার খবর নেই।

২৮টি দাঙ্গার মধ্যে ন’টি ঘটেছে ধর্মীয় শোভাযাত্রা ও উৎসব ঘিরে। পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ডে রাম নবমীর শোভাযাত্রা, মধ্যপ্রদেশে হনুমান জয়ন্তী, অসমে ঈদ উদযাপন এবং গুজরাটে গরবা অনুষ্ঠানের সময় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া ওয়াক্‌ফ সংশোধনী আইন বিরোধী আন্দোলন ঘিরেও একাধিক জায়গায় হিংসা ছড়ায়। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে এমনই এক ঘটনায় এক হিন্দু বাবা ও ছেলের মৃত্যু হয়।

রিপোর্টে রাজ্য সরকারের ভূমিকা নিয়েও তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। CSSS-এর দাবি, যেখানে সাম্প্রদায়িক হিংসায় হিন্দুরা ভুক্তভোগী হয়েছেন, সেখানে দ্রুত বিচার ও প্রশাসনিক উদ্যোগ দেখা গেলেও মুসলিম ভুক্তভোগীদের ক্ষেত্রে সেই একই রকম তৎপরতা চোখে পড়ে না। বিশেষ করে বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিতে প্রশাসন প্রায়শই হিন্দু দাঙ্গাকারীদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক  ও কঠোর পুলিশি ব্যবস্থা প্রয়োগ করেছে বলে অভিযোগ।

দাঙ্গার পরবর্তী সময়ে প্রশাসনিক বিবৃতি ও একাংশের মিডিয়া প্রচারে প্রায়শই মুসলিমদের ‘মাস্টারমাইন্ড’ বা ‘কিংপিন’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা দেখা গেছে বলেও রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। এর জেরে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বেশি গ্রেপ্তার, কঠোর জিজ্ঞাসাবাদ এবং দমনমূলক পুলিশি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে CSSS মনে করছে।

২০২৫ সালে খ্রিস্টানদের উপর হামলার ঘটনাও বিশেষ উদ্বেগের বিষয় বলে রিপোর্টে বলা হয়েছে। বড়দিন ঘিরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যে হামলা হয়েছে, তা আগের বছরের তুলনায় বেশি সংগঠিত ও আক্রমণাত্মক। ইউনাইটেড ক্রিশ্চিয়ান ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বর পর্যন্ত দেশে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে ৭০৬টি হিংসার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যার বেশির ভাগই ধর্মান্তর বিরোধী প্রচারের সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে ছত্তীসগঢ়ের মতো আদিবাসী অধ্যুষিত রাজ্যগুলিতে খ্রিস্টানদের কবর দেওয়ার অধিকার অস্বীকার করার ঘটনাকে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করেছে রিপোর্ট।

নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ, দায়বদ্ধ প্রশাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও আইনের শাসন রক্ষা করা সম্ভব নয় বলেই CSSS-এর  অভিমত।