আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভারতের বিমান তৈরির প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা খাতে আরও শক্তিশালী করতে ইউনিয়ন বাজেট ২০২৬-এ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করলেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন। বাজেট ভাষণে তিনি জানিয়েছেন, অসামরিক বিমান, প্রশিক্ষণ বিমান এবং অন্যান্য উড়োজাহাজ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ও কম্পোনেন্টের উপর বেসিক কাস্টমস ডিউটি পুরোপুরি মকুব করা হবে। এই সিদ্ধান্তের লক্ষ্য উৎপাদন খরচ কমানো, দেশীয় বিমান নির্মাণে উৎসাহ দেওয়া এবং ভারতের এই ইকোসিস্টেমকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলা।
এই শুল্ক ছাড়ের সুবিধা শুধু বিমান নির্মাণেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিরক্ষা খাতে মেইনটেন্যান্স, রিপেয়ার কাজে ব্যবহৃত বিমান যন্ত্রাংশ তৈরির জন্য যে কাঁচামাল আমদানি করা হয়, সেগুলির উপরও শুল্ক ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এর ফলে ভারতের ক্ষমতা বাড়বে এবং দেশকে একটি বড় আঞ্চলিক বিমান রক্ষণাবেক্ষণ ও সার্ভিসিং হাব হিসেবে গড়ে তোলার পথ আরও মসৃণ হবে বলে সরকারের আশা।
সরকারের মতে, এই পদক্ষেপ আত্মনির্ভর ভারতের লক্ষ্যকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে। আমদানির উপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো গেলে শুধু খরচ কমবে না, কর্মসংস্থানও বাড়বে এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতাও উন্নত হবে। একই সঙ্গে বেসামরিক ও প্রতিরক্ষা—দু’টি ক্ষেত্রেই ভারতের কৌশলগত সক্ষমতা আরও মজবুত হবে।
বাজেট ২০২৬-এ প্রতিরক্ষা ব্যয়ের ক্ষেত্রেও বড়সড় বৃদ্ধি ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী। ১ ফেব্রুয়ারি বাজেট পেশের সময় তিনি জানান, প্রতিরক্ষা খাতে মোট বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৫.৯৫ লক্ষ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবর্ষের বাজেট বরাদ্দ ৪.৯২ লক্ষ কোটি টাকার তুলনায় প্রায় ২১ শতাংশ বেশি। এই বৃদ্ধির মধ্যে প্রতিরক্ষা মূলধনী ব্যয়েও ২১ শতাংশ বৃদ্ধি রয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি গঠনের উপর সরকারের জোরকে স্পষ্ট করে।
এই বাড়তি বরাদ্দের ফলে চলতি অর্থবর্ষে প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির প্রায় ১১ শতাংশে পৌঁছেছে, যেখানে আগের বছর তা ছিল প্রায় ৮ শতাংশ। আধুনিকীকরণ, দ্রুত অস্ত্র ও সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং আমদানি নির্ভরতা কমানো—এই তিনটি বিষয়ই প্রতিরক্ষা নীতির কেন্দ্রে রয়েছে। শুধুমাত্র আধুনিকীকরণ খাতে বাজেট ২৪ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে, যা নতুন প্রযুক্তি, অস্ত্র ব্যবস্থা ও প্ল্যাটফর্ম আপগ্রেডের দিকে স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
গত কয়েক বছরে ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২০ সালের বাজেটের পর থেকে প্রতিরক্ষা খাতে মোট ব্যয় ৪০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং গত পাঁচ বছরে গড় বার্ষিক বৃদ্ধির হার প্রায় ৯.২ শতাংশ। ক্যাপেক্স বরাবরই সরকারের অগ্রাধিকারে রয়েছে, কারণ আধুনিকীকরণ ও দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে বড় বিনিয়োগ অপরিহার্য।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৯ অর্থবর্ষে প্রতিরক্ষা ক্যাপেক্স যার ছিল সেখান থেকে ২০২৬ অর্থবর্ষে তা হয়েছে ১.৯২ লক্ষ কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞ সংস্থাগুলির অনুমান, ২০২৭ অর্থবর্ষে এই বরাদ্দ প্রায় ২০ শতাংশ বেড়ে ২.৩ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছতে পারে এবং মোট প্রতিরক্ষা ব্যয়ের প্রায় ৩০ শতাংশই হবে ক্যাপেক্স।
দেশীয় উৎপাদন ও রপ্তানির ক্ষেত্রেও ভারতের অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো। ২০২৫ অর্থবর্ষে প্রতিরক্ষা উৎপাদন রেকর্ড ১.৫১ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছেছে এবং প্রতিরক্ষা রপ্তানি হয়েছে ২৩,৬২২ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ১২.০৪ শতাংশ বেশি। সরকার ২০২৯ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা উৎপাদন ৩ লক্ষ কোটি টাকা এবং রপ্তানি ৫০,০০০ কোটি টাকায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য স্থির করেছে।
সব মিলিয়ে, বাজেট ২০২৬ ভারতের বিমান তৈরি শিল্প ও প্রতিরক্ষা খাতে আত্মনির্ভরতা, আধুনিকীকরণে জোর দিয়েছে। ফলে বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতার বাজারে ভারত আরও এগিয়ে যাবে।
