আজকাল ওয়েবডেস্ক: বিজেপি-নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার সম্ভবত বর্ষাকালীন অধিবেশনে (জুলাই মাসের তৃতীয় সপ্তাহে শুরু হবে) 'সীমানা পুনর্নির্ধারণ বিল' সংসদে পুনরায় পেশ করবে। এই জল্পনা তুঙ্গে। 

২০১১ সালের জনগণনার ভিত্তিতে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণের লক্ষ্যে আনা 'সংবিধান সংস্কার (একশ একত্রিশতম সংশোধনী) বিল, ২০২৬' বা 'সীমানা পুনর্নির্ধারণ বিল'-টি গত এপ্রিলে সংসদে পাশ করাতে পারেনি মোদি সরকার। কারণ ই বিল পাশের জন্য প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এনডিএ শিবিরের ছিল না।

লোকসভায় এনডিএ-র দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভাব রয়েছে। এই ঘাটতির কারণে গত এপ্রিলে 'মহিলা সংরক্ষণ সংবিধান সংশোধনী বিল'-টিও পাশ করানো সম্ভব হয়নি। মহিলা সংরক্ষণ বিলটিকে সীমানা পুনর্নির্ধারণ বিলের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল, যার ফলে সেটিও ব্যর্থ হয়।

সোমবার তৃণমূল সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার দাবি করেন যে, লোকসভায় দলের ২০ জন সাংসদের সমর্থন তাঁর পক্ষে রয়েছে। দলত্যাগ বিরোধী আইন অনুযায়ী দল ভাঙার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যার চেয়ে যা একজন বেশি। বিদ্রোহী সাংসদরা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের বাসভবনে একটি বৈঠকে মিলিত হন। লোকসভায় তৃণমূলের মোট ২৯ জন সাংসদ রয়েছেন।

ওই ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদ একটি ব্লক গঠন করে কেন্দ্রে এনডিএ সরকারকে সমর্থন করার পরিকল্পনা করছেন। আর যদি তা বাস্তবায়িত হয়, তবে লোকসভায় এনডিএ-র আসন সংখ্যা প্রথমবারের মতো ৩০০-র গণ্ডি অতিক্রম করবে।

পাশাপাশি, এমকে স্ট্যালিনের নেতৃত্বাধীন ডিএমকে-র কাছ থেকে শর্তসাপেক্ষ সমর্থন আদায়ের বিষয়েও আলোচনা চলছে। উল্লেখ্য, ডিএমকে সম্প্রতি তামিলনাড়ু নির্বাচনে ধরাশায়ী হয়েছে। টিভিকে-র উত্থানের দিশাহার স্ট্যালিনের দল। ছেড়ে গিয়েছে একদা জোটসঙ্গী কংগ্রেসও।

তাও যদি ডিএমকে, এনডিএকে ইস্যুভিত্তিক সমনর্থনে রাজি হয়, তবে এনডিএ দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লক্ষ্যের আরও কাছাকাছি পৌঁছে যাবে।

বিজেপির এক প্রবীণ নেতা জানিয়েছেন যে, সরকার বর্ষাকালীন অধিবেশনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিল পেশ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এর মধ্যে রয়েছে ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচন থেকে ৩৩ শতাংশ নামহিলা সংরক্ষণ ব্যবস্থা কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় সংবিধান সংশোধনী বিল এবং 'এক দেশ, এক নির্বাচন'-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তিনি আরও জানান যে, এই বিলগুলি পেশ করার আগে এনডিএ দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছাকাছি পৌঁছানোর অপেক্ষায় রয়েছে।

দলের অভ্যন্তরীণ সূত্রের খবর অনুযায়ী, গত এপ্রিলে সংবিধান সংশোধনী বিলটি পাশ হতে ব্যর্থ হওয়ার পর থেকেই নরেন্দ্র মোদি সরকার দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের প্রচেষ্টা জোরদার করেছে।

পাঁচটি রাজ্যে সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল এনডিএ-র অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে।

সূত্রমতে, তামিলনাড়ুতে ডিএমকে-র পরাজয় এবং পরবর্তীতে কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্তের ফলে দলের ২২ জন সাংসদের কোনও নির্দিষ্ট বিষয়ের ভিত্তিতে এনডিএ-কে সমর্থন জানানোর সম্ভাবনা বেড়েছে। বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদদের সমর্থন এনডিএ-র পরিকল্পনার ক্ষেত্রে যেমন অপ্রত্যাশিত, তেমনই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সংখ্যাগত শক্তির বিচারে, ৫৪৩ সদস্যবিশিষ্ট লোকসভায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য ৩৬২ জন সাংসদের সমর্থন প্রয়োজন।

বর্তমানে তিনটি আসন (বসিরহাট, শিলং এবং নওগাঁ) সাংসলদ শূন্য। সংশ্লিষ্ট সাংসদদের মৃত্যুর কারণেই এই আসনগুলো শূন্য হয়েছে।

ফলে লোকসভায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় কার্যকর সংখ্যাটি ৩৬০-এ নেমে এসেছে। বর্তমানে এনডিএ-র হাতে রয়েছে ২৯৩ জন সাংসদের সমর্থন। যদি ২০ জন তৃণমূল সাংসদের ব্লক এনডিএ-কে সমর্থন জানায়, তবে এই সংখ্যা বেড়ে ৩১৩-তে দাঁড়াবে। আর যদি ২২ জন ডিএমকে সাংসদ নির্দিষ্ট ইস্যুতে বিষয়-ভিত্তিতে সমর্থন দেন, তবে মোট সংখ্যা বেড়ে ৩৩৫ হবে। সরকার উদ্ধব ঠাকরে-নেতৃত্বাধীন শিবসেনা (ইউবিটি)-র ন'জন সাংসদের দিকেও নজর রাখছে। তাদের দলে ভাঙন ধরলে আরও ছয়জন সাংসদের সমর্থন পাওয়া যেতে পারে। তাহলে এনডিএ-র পক্ষে সাংসদের সমর্থন ৩৪১ হয়ে যেতে পারে।

গত এপ্রিলে সংবিধান সংশোধনী বিলের ওপর ভোটাভুটির সময় এনডিএ ২৯৮ জন সাংসদের সমর্থন পেয়েছিল, অর্থাৎ তারা তাদের মূল শক্তির বাইরেও কিছু অতিরিক্ত ভোট পেয়েছিল। এই পাঁচটি অতিরিক্ত ভোট বিবেচনায় নিলে এনডিএ-র সম্ভাব্য সংখ্যা ৩৪৮-এ পৌঁছাতে পারে, যা দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে মাত্র ১২ ভোট কম।

সরকার অন্যান্য ছোট দল, নির্দল সাংসদ এবং 'ক্রস-ভোটিং'-এর (দলের নির্দেশ অমান্য করে অন্য পক্ষে ভোট দেওয়া) মাধ্যমে এই ব্যবধান পূরণ করার আশা করছে। সংবিধান সংশোধনী বিল পাশ করার জন্য বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন হয়। এর জন্য সংসদের মোট সদস্যসংখ্যার অন্তত অর্ধেক সদস্যের উপস্থিতি আবশ্যক। বিলটি পাশ করাতে হলে উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন।

গত এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিত ভোটাভুটির সময় ৫২৮ জন সাংসদ উপস্থিত ছিলেন, ফলে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাটি ছিল ৩৫২। বিলটির পক্ষে ২৯৮টি এবং বিপক্ষে ২৩০টি ভোট পড়েছিল, যার ফলে এটি ৫৪ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়। সরকার এখন সেই ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে এনেছে।

রাজ্যসভাতেও এনডিএ দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। এক্ষেত্রে তৃণমূলের ১৩ জন সাংসদ ছিলেন, যাঁদের মধ্যে একজন (সুখেন্দু শেখর রায়) পদত্যাগ করেছেন। তিনি এখন বিজেপির প্রতিনিধি হিসেবে পুনরায় রাজ্যসভায় ফিরে আসতে পারেন।

তৃণমূলের অন্য সাংসদরাও একই পথ অনুসরণ করতে পারেন, অর্থাৎ পদত্যাগ করে উপনির্বাচনের মাধ্যমে রাজ্যসভায় ফিরে আসা।

উচ্চকক্ষে এনডিএ ইতিমধ্যেই ১৫০টি আসনের গণ্ডি পার করেছে। সেখানে থাকা ডিএমকে-র আটজন সাংসদও শর্তসাপেক্ষে সমর্থন জানাতে পারেন। রাজ্যসভায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাটি হল ১৬৪। এই পরিস্থিতিতে, অন্যান্য ছোট দলের সমর্থন পেলে এনডিএ-র পক্ষেও সেই সংখ্যার কাছাকাছি পৌঁছানো সম্ভব বলে মনে হচ্ছে।