আবু হায়াত বিশ্বাস, দিল্লি: ২০২১ সালে কৃষক আন্দোলনে চাপে পড়েছিল দল। অনড় মনোভাবের কাছে হার মানতে হয়েছিল বিজেপি সরকারকে। অন্নদাতাদের চাপের কাছে প্রত্যাহার করতে হয়েছিল তিন কৃষি আইন। ফের একবার প্রশ্নফাঁস নিয়ে সরকারকে প্রবল চাপে ফেলেছিল ছাত্র- যুবরা। যার ফলশ্রুতি, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হল। নিট-ইউজি প্রশ্নফাঁসকে ঘিরে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ছাত্র-যুবদের ক্ষোভ শেষ পর্যন্ত এমন এক রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি করল, যার সামনে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হল নরেন্দ্র মোদি সরকার। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগকে রাজনৈতিক মহল কেবল একটি মন্ত্রীর বিদায় হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘদিনের জনচাপ, বিরোধীদের ধারাবাহিক আক্রমণ এবং সর্বভারতীয় ছাত্র আন্দোলনের সম্মিলিত ফল হিসেবেই দেখছে। ২০১৪ সালে মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর জনআন্দোলনের চাপে কোনও পূর্ণমন্ত্রীর পদত্যাগের ঘটনা এই প্রথম।

 

নিট প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ সামনে আসতেই কংগ্রেস ‘ছাত্রোঁ কি গুঞ্জ’ কর্মসূচি শুরু করে। রাজস্থানের কোটা, উত্তরাখণ্ডের দেরাদুনে রাহুল গান্ধীর সমাবেশ হয়। একই সময়ে দিল্লির যন্তর-মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-র অবস্থান আন্দোলন দ্রুত জাতীয় গুরুত্ব পায়। পরে এসএফআই, আইসা-সহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলও আন্দোলনের পাশে দাঁড়ায়। পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুকের অনশন আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দেয়। দিল্লি ছাড়িয়ে আন্দোলনের ঢেউ বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে পড়তেই সরকারের অস্বস্তি বাড়তে থাকে। 

 

আগামী বছর বেশ কয়েকটি রাজ্যে ভোট, তার আগে প্রশ্নফাঁস ইস্যু বড় আকার ধারণ করলে ফল খারাপ হতে পারে। অগত্য ধর্মেন্দ্র প্রধানকে ইস্তফা দেওয়ার সিদ্ধান্ত। 

দিল্লিতে আন্দোলন দমনে লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহারের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে। সংসদের বাইরে ছাত্রদের অনড় অবস্থান এবং বাদল অধিবেশনে বিরোধীদের লাগাতার বিক্ষোভে কার্যত চাপে পড়ে সরকার। 

 

সূত্রের দাবি, আন্দোলন যদি আরও বিস্তৃত আকার নিত, তবে তার রাজনৈতিক প্রভাব একাধিক রাজ্যে পড়তে পারত। সেই আশঙ্কাই বিজেপিকে ব্যাকফুটে ঠেলে দেয়। প্রথমদিকে সরকার সংস্কারের আশ্বাস দিয়েই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। পাবলিক এগজামিনেশনস (প্রিভেনশন অব আনফেয়ার মিনস) আইন, ২০২৪-এ সংশোধনের কথা ঘোষণা করা হয়। প্রশ্নফাঁসের মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ফাস্ট-ট্র্যাক আদালতের প্রস্তাব আনা হয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও সরাসরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় উদ্যোগী হন। এনটিএ-র ৪৭ জন আধিকারিককে বরখাস্ত করা হয়, তাঁদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার কথাও জানানো হয়। শিক্ষা মন্ত্রকের দুই সচিবকে বদলি করা হয়। কিন্তু এতেও আন্দোলন থামেনি। আন্দোলনকারীদের একটাই অবস্থান ছিল—ধর্মেন্দ্র প্রধানকে রাজনৈতিক দায় স্বীকার করে পদত্যাগ করতেই হবে।

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ মোদি সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মোড়। অতীতেও ২০১৫ সালে ভূমি অধিগ্রহণ আইন সংশোধনের অধ্যাদেশ প্রত্যাহার, ২০১৮ সালে ‘মি টু’ অভিযোগে এম জে আকবরের পদত্যাগ এবং ২০২১ সালে কৃষক আন্দোলনের চাপে তিন কৃষি আইন প্রত্যাহারের মতো ঘটনায় সরকার পিছিয়ে এসেছিল। তবে ছাত্র আন্দোলনের চাপে একজন পূর্ণমন্ত্রীর পদত্যাগ নিঃসন্দেহে আলাদা তাৎপর্য বহন করছে। উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে তৎকালীন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছিলেন, ‘‌আমাদের সরকারে ইস্তফা হয় না।’‌ সেই মন্তব্যেরই রাজনৈতিক পাল্টা প্রতীক হয়ে উঠেছে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। সিজেপি প্রধান অভিজিৎ দীপকে বলেন, ‘‌এই সরকারে নাকি ইস্তফা হয় না, ছাত্ররাই সেই ধারণা ভেঙে দিয়েছে।’‌ বিরোধীদের দাবি, ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ প্রমাণ করল, সংগঠিত গণআন্দোলন ও জনচাপ এখনও গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে নির্ণায়ক শক্তি হয়ে উঠতে পারে।