দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে ষষ্ঠ শ্রেণীর এক ১২ বছরের নাবালিকাকে গণধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় তোলপাড় রাজ্য। গণপিটুনিতে এক অভিযুক্তের মৃত্যুর পর, ঘটনার পুনর্নির্মাণ করতে গিয়ে রবিবার রাতে পুলিশের গুলিতে খতম হয়েছে মূল অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডল। পুলিশি হেফাজত থেকে সাব-ইন্সপেক্টর রনি সরকারের রিভলভার কেড়ে নিয়ে পালাতে গিয়ে পাল্টা গুলিতে প্রভাসের এই মৃত্যু এ রাজ্যে ‘অন-স্পট জাস্টিস’ বা পুলিশি এনকাউন্টার নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উস্কে দিয়েছে।
বারুইপুরের এই মাঝরাতের এনকাউন্টারের ঘটনা যখন খবরের শিরোনামে, ঠিক তখনই অপরাধ জগৎ এবং আমজনতার স্মৃতিতে ফিরে আসছে ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে চর্চিত, বিখ্যাত এবং একই সঙ্গে ‘কুখ্যাত’ এক এনকাউন্টার স্পেশালিস্টের নাম— দয়া নায়েক । যিনি নয়ের দশকে মায়ানগরী মুম্বই কাঁপানো আন্ডারওয়ার্ল্ডের ৮০-রও বেশি দুর্ধর্ষ গ্যাংস্টারকে একাই খতম করেছিলেন। সম্প্রতি বলিউড নবাব সাইফ আলী খানের ওপরে হওয়া প্রাণঘাতী হামলার তদন্তেও যাঁর নাম জড়িয়েছে। কিন্তু খাকি উর্দির পেছনে কেমন ছিল এই রহস্যময় অফিসারের লাইফস্টাইল ও জীবনের উত্থান-পতন? তা যেকোনও মেগাস্টার অভিনীত বলিউড সিনেমার চিত্রনাট্যকেও অনায়াসে হার মানাবে।
আজকের দয়া নায়েককে যারা চেনেন, তারা হয়তো জানেন না যে তাঁর এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে চরম দারিদ্র্য আর জেদের এক অবিশ্বাস্য গল্প। কর্ণাটকের উদুপির এক কন্নড়ভাষী পরিবারে জন্ম দয়া নায়েকের। গ্রামের স্কুলে সপ্তম শ্রেণী পাস করার পর, ১৯৭৯ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দিতে পকেটে শূন্য টাকা নিয়ে মুম্বইয়ে পা রেখেছিলেন এই কিশোর।
মুম্বইয়ে তাঁর প্রথম চাকরি ছিল একটি সাধারণ হোটেলের টেবিল বয় বা খালাসি হিসেবে। যেখানে কাজ করতেন, সেই হোটেলের বারান্দায় বা পোর্টিকোতে শুয়ে রাত জেগে পড়াশোনা করে গোরেগাঁওয়ের এক মিউনিসিপ্যাল স্কুল থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পাস করেন তিনি। এরপর আন্ধেরির সিইএস কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন। পেট চালাতে এরপর যখন একজন প্লাম্বার বা কলমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করছিলেন, তখনই কিছু নারকোটিক্স অফিসারের সংস্পর্শে আসেন এবং মনে দানা বাঁধে পুলিশের চাকরি করার স্বপ্ন। অবশেষে ১৯৯৫ সালে, মুম্বইয়ে আসার দীর্ঘ ১৫ বছর পর, জুহু থানার সাব-ইন্সপেক্টর হিসেবে যোগ দেন দয়া নায়েক।
দয়া নায়েক যখন পুলিশে যোগ দেন, তখন মুম্বইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ড মধ্যগগনে। দাউদ ইব্রাহিম, ছোট রাজনদের শার্পশুটাররা তখন কার্যত রাজত্ব চালাচ্ছে রাজপথে। ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বর মাসে জুহু এলাকায় ছোট রাজন গ্যাংয়ের দুই গ্যাংস্টার দয়া নায়েকের ওপর গুলি চালায়। আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালিয়ে প্রথমবার আন্ডারওয়ার্ল্ডের দুজনকে খতম করেন তিনি।
এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক এনকাউন্টার করে আন্ডারওয়ার্ল্ডের মেরুদণ্ড ভেঙে দেন তিনি। ‘এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট’ হিসেবে তাঁর নাম শুনলেই দাদারা ডেরা বদলাত। এই রুদ্ধশ্বাস জীবনযাত্রার ওপর ভিত্তি করেই বলিউডে তৈরি হয়েছিল ‘আব তক ছাপ্পান’ বা ‘ডিপার্টমেন্ট’-এর মতো সুপারহিট সিনেমা।
লাইফস্টাইল ডেস্কের নজর কাড়ে দয়া নায়েকের জীবনের অন্য এক অন্ধকার ও বিতর্কিত দিক। একজন সাধারণ সাব-ইন্সপেক্টরের জীবনযাত্রা কীভাবে রাতারাতি বদলে গেল কোটি কোটি টাকার সম্পত্তিতে? ২০০৪ সালে তাঁর বিরুদ্ধে আয়ের উতসের চেয়ে অতিরিক্ত সম্পত্তি জমানোর অভিযোগে মামলা দায়ের হয়। মোকা (MCOCA) কোর্টের নির্দেশে অ্যান্টি-করাপশন ব্যুরো (ACB) তাঁর বাড়ি এবং বিভিন্ন ডেরায় তল্লাশি চালায়।
সেই তল্লাশিতে যে তথ্য সামনে আসে, তা দেখে চোখ কপালে ওঠে আমজনতার। জানা যায়, হোটেল বয় হিসেবে জীবন শুরু করা দয়া নায়েক মুম্বই এবং কর্ণাটকে বিলাসবহুল লাক্সারি বাসের আস্ত দুটি ফ্লিট বা ট্রাভেল এজেন্সির মালিক! আন্ধেরির ‘বিশাল ট্রাভেলস’ সহ কোটি কোটি টাকার বেনামী সম্পত্তির হদিশ মেলায় তাঁকে গ্রেপ্তারও হতে হয়। ২০১০ সালে চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়ার পর, ২০১২ সালে সমস্ত আইনি জটিলতা কাটিয়ে আবার অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার হিসেবে কামব্যাক করেন তিনি।
বারুইপুরের এনকাউন্টার হোক বা মুম্বইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ড দমনের ইতিহাস— খাকি উর্দির আড়ালে দয়া নায়েকদের মতো অফিসারদের এই রহস্যময় ও রাজকীয় লাইফস্টাইল সব সময়ই অপরাধের দুনিয়াকে এক সুতোয় বেঁধে রাখে।















