আজকাল ওয়েবডেস্ক: ক্রমশ কমে যাওয়া জন্মহার নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে একটি নতুন জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা নীতি আনতে চলেছে অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার। মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু নেতৃত্বাধীন সরকার গত সপ্তাহে রাজ্য বিধানসভায় একটি খসড়া Population Management Policy পেশ করেছে, যার লক্ষ্য পরিবারকে দুই বা তিনটি সন্তান নিতে উৎসাহিত করা এবং একই সঙ্গে নারীস্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও বৃদ্ধদের যত্নের ব্যবস্থা উন্নত করা।
সরকারের মতে, অন্ধ্রপ্রদেশে মোট উর্বরতা হার (Total Fertility Rate বা TFR) এখন বিপজ্জনকভাবে কমে এসেছে। বর্তমানে রাজ্যে এই হার ১.৫, অর্থাৎ গড়ে একজন মহিলা জীবনে দেড়টি সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন। জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে সাধারণত ২.১-এর মতো জন্মহার দরকার বলে জনসংখ্যাবিদরা মনে করেন। ২০০৩ সালে, যখন অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানা একসঙ্গে ছিল, তখন এই হার ছিল ২.২। গত দুই দশকে তা ধারাবাহিকভাবে কমেছে।
এই প্রবণতা শুধু অন্ধ্রপ্রদেশে নয়, দক্ষিণ ভারতের বহু রাজ্যেই দেখা যাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে তামিল নাড়ুতে জন্মহার নেমে এসেছে ১.৩-এ, আর কেরল ও কর্নাটকে তা প্রায় ১.৫। অন্যদিকে উত্তর ভারতের তুলনামূলক দরিদ্র রাজ্যগুলিতে জন্মহার এখনও অনেক বেশি। যেমন বিহারে এই হার ২.৮, আর উত্তর প্রদেশে ২.৬।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জন্মহার কমে যাওয়া সাধারণত শিক্ষা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, নগরায়ণ এবং নারীর ক্ষমতায়নের সঙ্গে যুক্ত। তবে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রভাবও রয়েছে। জন্মহার কমলে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে যায় এবং বয়স্ক মানুষের অনুপাত বাড়তে থাকে। এতে অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়তে পারে এবং ভবিষ্যতে সামাজিক সুরক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার খরচও বেড়ে যেতে পারে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার একটি নতুন নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে, যাকে তারা বলছে “population management”, অর্থাৎ জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বদলে জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা। খসড়া নীতিতে পরিবারকে দ্বিতীয় বা তৃতীয় সন্তানের জন্ম দিলে ₹২৫,০০০ নগদ পুরস্কার দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। তৃতীয় সন্তানের ক্ষেত্রে প্রথম পাঁচ বছর প্রতি মাসে ₹১,০০০ পুষ্টি সহায়তা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। পাশাপাশি দ্বিতীয় ও তৃতীয় সন্তানের জন্য ১৮ বছর পর্যন্ত সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে শিক্ষা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকার বন্ধ্যাত্ব সমস্যায় ভোগা দম্পতিদের জন্যও কিছু উদ্যোগ নিতে চাইছে। প্রায় ১১.৭ লক্ষ দম্পতির জন্য IVF বা ইন-ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন চিকিৎসা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে ভর্তুকি দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
খসড়া নীতিতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কিছু নির্দিষ্ট সমস্যার দিকেও নজর দেওয়া হয়েছে। অন্ধ্রপ্রদেশে বর্তমানে প্রায় ৬৭.৫ শতাংশ প্রসব সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে হয়, যা দেশের মধ্যে অন্যতম বেশি। সরকারের ধারণা, অনেক বেসরকারি হাসপাতালে আর্থিক লাভের জন্য অপ্রয়োজনীয়ভাবে সিজারিয়ান করা হয়। এর ফলে অনেক পরিবার প্রথম সন্তানের পর আর সন্তান নিতে আগ্রহী হয় না। নতুন নীতিতে এই হার কমিয়ে ৪০ শতাংশের নিচে নামানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া কিশোরী গর্ভধারণ কমানো এবং পুরুষদের মধ্যে নির্বীজকরণের হার কমানোর ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য পরিষেবায় দক্ষ কর্মী তৈরি করার লক্ষ্যে প্রতি বছর অন্তত ১০,০০০ স্বাস্থ্য সহায়ক প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যারা মূলত শিশু, কিশোর এবং বৃদ্ধদের স্বাস্থ্যসেবায় কাজ করবে।
অন্ধ্রপ্রদেশে জনসংখ্যার বার্ধক্যও দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে রাজ্যের মধ্যম বয়স ৩২.৫ বছর, যেখানে ভারতের গড় ২৮.৪ বছর। রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ এখন ৬০ বছরের বেশি বয়সী, এবং ২০৪৭ সালের মধ্যে তা ২৩ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এই কারণে বৃদ্ধদের স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করাও নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
একই সঙ্গে রাজ্যে মহিলাদের কর্মসংস্থানের হারও উদ্বেগজনকভাবে কম। অন্ধ্রপ্রদেশে মহিলাদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ মাত্র ৩১ শতাংশ, যেখানে জাতীয় গড় ৩৭ শতাংশ। সরকার মনে করছে, মহিলা কর্মসংস্থান ও স্বাস্থ্যসেবা উন্নত করা গেলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এই জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়েও ইতিমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। তামিল নাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন যে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলির জনসংখ্যা তুলনামূলক কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে সংসদে তাদের প্রতিনিধিত্ব কমে যেতে পারে। কারণ সংসদীয় আসন নির্ধারণ মূলত জনসংখ্যার ভিত্তিতে হয় এবং দীর্ঘদিন স্থগিত থাকা সীমা পুনর্বিন্যাস প্রক্রিয়া আবার শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
খসড়া নীতি উপস্থাপন করার সময় মুখ্যমন্ত্রী নাইডু বলেন, রাজ্যের সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। তাঁর কথায়, “এখন যদি আমরা পদক্ষেপ না নিই, তাহলে ভবিষ্যতে রাজ্যের অর্থনৈতিক কাঠামো বড় চাপে পড়তে পারে।” সরকারের আশা, এই নতুন নীতি শুধু জন্মহার বাড়াতেই সাহায্য করবে না, পাশাপাশি নারী স্বাস্থ্য, বৃদ্ধদের যত্ন এবং ভবিষ্যতের কর্মশক্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
