নিতাই দে, আগরতলা:‌ সন্তানদের সঙ্গে বাড়িতে মাতৃভাষাতেই কথা বলতে হবে। তাদের মাতৃভাষা লেখা ও পড়া শেখাতে হবে। মাতৃভাষা না জানলে তারা নিজেদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য থেকে বঞ্চিত হবে। শুক্রবার বিকেলে আগরতলার হাঁপানিয়ায় আন্তর্জাতিক মেলা প্রাঙ্গণের ইন্ডোর হলে আয়োজিত পূর্ব, উত্তর–পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলের যৌথ আঞ্চলিক রাজভাষা সম্মেলনের উদ্বোধন করে অভিভাবকদের প্রতি এই আহ্বান জানান কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। ভাষণে তিনি ছত্রপতি শিবাজী মহারাজের জীবনাদর্শের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘‌স্বরাজ মানে শুধু নিজের শাসন নয়। স্বরাজ হল স্বভাষা, স্বরাজ ও স্বধর্ম।’‌ তিনি বলেন, সংবিধান প্রণেতারা শিবাজী মহারাজের আদর্শ থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই হিন্দি ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিয়েছেন এবং এই ভাষাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।


 তিনি স্পষ্ট করে বলেন, হিন্দি ভাষার সঙ্গে কোনও স্থানীয় ভাষার লড়াই নেই। ভাষা ও লিপি এগিয়ে যাওয়ার মাধ্যম। সব ভাষার সমন্বয়েই দেশ এগিয়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় সরকার সব ভাষার বিকাশে কাজ করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের উন্নত দেশগুলি নিজেদের ভাষাতেই জ্ঞান অর্জন করে অগ্রগতি সাধন করেছে। যেকোনও বিষয় মাতৃভাষাতেই সবচেয়ে ভালভাবে বোঝানো যায়। শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা মাতৃভাষায় দেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে।


তিনি বলেন, ২০১৪ সালের আগে উত্তর–পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রাজ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যকলাপ চলত। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দায়িত্ব গ্রহণের পর বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে ২১টি শান্তিচুক্তি হয়েছে এবং প্রায় ১১ হাজার যুবক অস্ত্র ছেড়ে মূল স্রোতে ফিরে এসেছে। বর্তমানে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে শান্তির পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এর ফলে পর্যটন ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা বহুগুণে বেড়েছে। উত্তর–পূর্বাঞ্চল এখন বিবাদের নয়, বিকাশের অঞ্চল। 


তিনি আরও বলেন, উত্তর–পূর্বাঞ্চল সাংস্কৃতিকভাবে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এখানে বিভিন্ন ভাষাভাষীর মানুষ বসবাস করেন। বছরে প্রায় ৫০ ধরনের উৎসব পালিত হয় এবং এই অঞ্চলের ৩০টি নৃত্যশৈলী দেশব্যাপী পরিচিতি লাভ করেছে।


এই প্রসঙ্গে তিনি উত্তর–পূর্বের গুণী ব্যক্তিত্বদের কথা উল্লেখ করে বলেন, শচীন দেববর্মণ, রাহুল দেববর্মণ, ড. ভূপেন হাজারিকা, জুবিন গর্গ ও ডেনি ডেংজংপা হিন্দি ভাষার মাধ্যমেই সর্বভারতীয় পরিচিতি লাভ করেছেন। একইসঙ্গে তিনি মহাত্মা গান্ধী, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল, রাজা রামমোহন রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ড. বিআর আম্বেদকর ও সি রাজাগোপালাচারির অবদানের কথাও স্মরণ করেন।


দেশ গঠন ও নীতি নির্ধারণে রাষ্ট্রভাষা ও স্থানীয় ভাষা–উভয়ের গুরুত্ব রয়েছে বলে উল্লেখ করে তিনি রাষ্ট্রভাষার প্রচার ও প্রসারে সকলকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ত্রিপুরায় একটি ভিন্ন দাবি উঠেছে এবং সেই প্রেক্ষিতে তিনি আবেদন করেন দেবনাগরী লিপি গ্রহণের জন্য। তাঁর যুক্তি, উত্তর–পূর্ব ভারতের অধিকাংশ জনজাতি ইতিমধ্যেই তাদের নিজস্ব ভাষার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট লিপি গ্রহণ করেছে। ফলে একক ও সুসংহত ব্যবস্থার মাধ্যমে ভাষার বিকাশ আরও সহজ হবে। 


তিনি আরও দাবি করেন, ত্রিপুরায় ভাষা নিয়ে কোনও বিরোধ নেই। রাজ্যের মানুষ দ্বিধাহীনভাবে বাংলা, ককবরক ও হিন্দি, এই তিনটি ভাষাই ব্যবহার ও গ্রহণ করেছেন। তবে রাজনৈতিক মহলে অন্য চিত্র। রাজ্যের শাসক দল বিজেপি দেবনাগরী লিপির পক্ষে সওয়াল করছে। অন্যদিকে তাদের জোটসঙ্গী তিপ্রা মথা ককবরক ভাষার জন্য রোমান লিপি চালুর দাবিতে অনড় অবস্থান নিয়েছে।

জনজাতি সমাজের একাংশের দাবি, ককবরক ভাষার ঐতিহাসিক ও ব্যবহারিক দিক বিবেচনায় রোমান লিপিই অধিক গ্রহণযোগ্য। অন্যদিকে বিজেপির বক্তব্য, দেবনাগরী লিপি গ্রহণ করলে প্রশাসনিক ও শিক্ষাব্যবস্থায় সমন্বয় সহজ হবে।
 সব মিলিয়ে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে সরাসরি ককবরক শব্দ উচ্চারিত না হলেও, চলমান লিপি–বিতর্কের দিকেই যে ইঙ্গিত ছিল তা রাজনৈতিক মহলে স্পষ্ট বলেই মনে করা হচ্ছে।

 সম্মেলনের সফল আয়োজনের জন্য তিনি মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা ও রাজ্য সরকারকে অভিনন্দন জানান।
 অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা বলেন, ভারত ভাষাগত বৈচিত্র্যের এক অনন্য দেশ। হিন্দি সেই বৈচিত্র্যকে একসূত্রে বাঁধার শক্তিশালী মাধ্যম। আঞ্চলিক ভাষার স্বকীয়তা বজায় রেখে হিন্দির প্রসারই উত্তর–পূর্বাঞ্চলের মূল দর্শন। আঞ্চলিক ভাষাই আমাদের আত্মপরিচয়। আর সেই পরিচয়ের সঙ্গে হিন্দির মেলবন্ধন আধুনিক ভারতের শক্তি।


 তিনি বলেন, হিন্দি বর্তমানে বিশ্বের তৃতীয় সর্বাধিক কথিত ভাষা এবং সরকার ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগের একটি কার্যকর মাধ্যম। প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে বিশ্বমঞ্চে ভারতীয় ভাষা ও সংস্কৃতির নবজাগরণ ঘটেছে। রাষ্ট্রসংঘ কিংবা জি–২০ সম্মেলনে নিজের ভাষায় বক্তব্য রেখে প্রধানমন্ত্রী ভারতীয় ভাষার মর্যাদা বৃদ্ধি করেছেন। তিনি প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর রাষ্ট্রসংঘে দেওয়া ঐতিহাসিক হিন্দি ভাষণের কথাও স্মরণ করেন।


মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার স্কুল থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। ত্রিপুরার জনগণও হিন্দির প্রতি শ্রদ্ধাশীল। রাজ্যের শিক্ষাক্ষেত্রে হিন্দি সাহিত্যচর্চা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাশাপাশি আঞ্চলিক ও জনজাতীয় ভাষার সংরক্ষণ ও বিকাশেও রাজ্য সরকার আন্তরিক।


 অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বানডি সঞ্জয় কুমার, সাংসদ বিপ্লব কুমার দেব, সাংসদ কৃতিদেবী সিং দেববর্মণ, সাংসদ রাজীব ভট্টাচার্য, নাগাল্যান্ডের নাগরি লিপি পরিষদের অধিকর্তা ড. বিপি ফিলিপ এবং ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দি বিভাগের অধ্যাপিকা প্রফেসর মিলন রাণী জমাতিয়া।


অনুষ্ঠান শুরুর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইন্ডোর হল প্রাঙ্গণে বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যাঙ্কের স্টল পরিদর্শন করেন। মঞ্চে তিনি বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংস্থাকে ক্ষেত্রীয় রাজভাষা পুরস্কারে সম্মানিত করেন এবং কেন্দ্রীয় রাজভাষা বিভাগ প্রকাশিত কয়েকটি গ্রন্থের আবরণ উন্মোচন করেন। 


ত্রিপুরা সহ বিভিন্ন রাজ্য থেকে প্রায় তিন হাজার প্রতিনিধি এই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। টেকনো ইন্ডিয়া ইউনিভার্সিটি ও টেকনো ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, আগরতলা–সহ বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরাও উপস্থিত ছিলেন।
 সন্ধের বিশেষ বিমানে দিল্লির উদ্দেশে রওনা দেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।