আজকাল ওয়েবডেস্ক: মুম্বইয়ের রাজনীতিতে পাওয়ার হাউসের দেওয়ালে চিড় ধরেছিল বছর খানেক আগেই। কাদা ছোড়াছুড়ির পর্ব মিটিয়ে, বাণিজ্য নগরে পাওয়ার হাউসের আলো একসঙ্গে জ্বলবে ফের, সে জল্পনাও মুম্বইয়ের ভোট বাজারে তীব্র হয়েছে গত কয়েকদিনে। কিন্তু এক সময়ে পরিবারকে ঠকানো, মিত্র শিবিরকে পিঠে ছুরি মারার অভিযোগ উঠেছিল যাঁর বিরুদ্ধে, মুম্বইয়ের রাজনীতির বহু সমীকরণ বদলেছেন যিনি নানা সময়ে, থমকে গেল তাঁর পলিটিক্যাল ব্লু প্রিন্ট বানানোর কাজ।
২৮ জানুয়ারি ২০২৬। বুধবার। ভারতের রাজনীতি, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিমান বিপর্যয় এবং মৃত্যুর তালিকায় যুক্ত হল আরও একটি নাম। অজিত পাওয়ার। মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী অজিত পাওয়ার, বুধবার বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে তাঁর।
কবেই লেখা হয়েছে, দুঃসংবাদ ছড়িয়ে পড়ে দাবানলের মতো। বিমান ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যে আগুন জ্বলছে, তার থেকেও দ্রুততার সঙ্গে মুম্বইয়ে ছড়িয়েছে অজিতের না থাকার খবর। কেউ বলছেন, তিনি কথা বলতে চেয়েছিলেন কাকার সঙ্গে, তার আর হল না। কেউ মানছেনই না, অজিত দাদা আর নেই। অজিত পাওয়ার জেলা পরিষদ নির্বাচনের আগে বারামাতিতে চারটি জনসভায় ভাষণ দেওয়ার উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন। মুম্বই থেকে চার্টার করা বোম্বার্ডিয়ার লিয়ারজেট ৪৫ বিমানে করে তিনি বারামাতির উদ্দেশে রওনা দেন। তবে অবতরণের আগেই বিমানটি দুর্ঘটনাগ্রস্ত হয়। দুর্ঘটনার তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে সম্পূর্ণ বিমানটি আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ঘটনার কিছুক্ষনেই জানা যায়, অজিত পাওয়ার-সহ চারজনের মৃত্যু হয়েছে।
এক নজরে, অজিত পাওয়ার এবং মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে পাওয়ার হাউস-
অজিত পাওয়ার। মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে, হেভিওয়েট নেতা। রাজনীতিতে উত্থান মূলত, কাকা শরদ পাওয়ারের ছাতার তলায় দাঁড়িয়ে থেকেই। পরে রাজনীতি আর ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকতে, সেই কাকার হাত ছেড়ে, কাকার গড়ে তোলা দলও ছাড়তে পিছপা হননি।
১৯৫৯ সালের ২২ জুলাই মহারাষ্ট্রের আহমেদনগর জেলার দেওলালি প্রভার গ্রামে জন্ম অজিত পাওয়ারের। বাবা অনন্তরাও পাওয়ার রাজনীতি থেকে কয়েক যোজন দূরেই ছিলেন। ফলে প্রাথমিক জীবনে অজিত পাওয়ার উপর সরাসরি রাজনীতির প্রভাব পড়েনি। পড়ে, বেশকিছুটা পর, যখন সরাসরি রাজনীতির ময়দানে ঢুকে পড়েন শরদ পাওয়ার।
১৯৮২। সমবায় চিনি কারখানার বোর্ড গঠনের সময়, প্রথম ভোটাভুটির মধ্যে ঢুকে পড়া অজিতের।
১৯৯১, পুনের কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাঙ্কের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
ওই একই বছরে বারামতি লোকসভা কেন্দ্র থেকে ভোট লড়েন তিনি। পরে বারামতি বিধানসভা কেন্দ্র থেকে সাতবার বিধায়ক হন অজিত পাওয়ার।
১৯৯১ থেকে ১৯৯২, সুধাকররাও নায়েকের সরকারের কৃষি ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।
১৯৯২ সালে মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী হন শরদ পাওয়ার। তখন তিনি মাটি সংরক্ষণ, বিদ্যুৎ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী হন অজিত পাওয়ার।
পরবর্তীকালে মহারাষ্ট্রের একাধিক মুখ্যমন্ত্রীর সময় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
ততদিনে অজিত পাওয়ার এবং শরদ পাওয়ার, দুই প্রজন্ম মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে গড়ে ফেলেছেন পাওয়ার হাউস। কিন্তু সেই পাওয়ার হাউসে চিড় ধরে ক্ষমতা, ক্ষমতার কেন্দ্রকে ঘিরে।
২০২৩ সালে, এনসিপির সভাপতি কে হবেন, তা নিয়ে শুরু হয় টানাপোড়েন। শরদ পাওয়ার বিস্তর চিন্তা ভাবনা করে তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে কন্যা সুপ্রিয়া সুলেকে বেছে নিতেই, সেই সুযোগ কাজে লাগায় বিজেপি। অজিত পাওয়ারকে দিয়ে এনসিপি ভাঙার মোক্ষম সুযোগ বিজেপি শিবসেনা ভাঙার পর থেকেই নাকি খুঁজছিল, বাণিজ্য নগরীতে কান পাতলে সেই সময় একথা শোনা যেত অলি গলিতে। তা সফল হয়েও যায়। এনসিপি থেকে একগুচ্ছ নেতা, বিধায়ক নিয়ে সরে দাঁড়ান অজিত পাওয়ার। ২০২৩ সালের জুলাই মাসে ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি (NCP) বিভক্ত করে নিজস্ব একটি গোষ্ঠী নিয়ে মহারাষ্ট্রের মহাযুতি সরকারে যোগ দেন। ফের মহারাষ্ট্র সরকারের উপমুখ্যমন্ত্রী হন।
কাকার তৈরি দলের অধিকারও কেড়ে নিতে চেয়েছেন কাকার থেকেই। বৃহন্মুম্বই মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন ভোটেও এবার শরদ পাওয়ায় শিবির থেকে এগিয়ে ছিলেন বহু। তবে মধ্যবর্তী সময়ে কাকা ভাইপো নানা সময়ে সাক্ষাৎ করে, মুম্বইয়ের রাজনীতিতে মাঝে মাঝেই চমক ধরিয়েছেন। এবং উদ্বেগ উত্তেজনায় জল ঢেলে বলেছেন, নেহাতই পারিবারিক সৌজন্য সাক্ষাৎ।
দীর্ঘ রাজনীতির জীবনে, নাম জড়িয়েছে বহু বিতর্কে। ৭০হাজার কোটি টাকার সেচ কেলেঙ্কারিতে নাম জড়িয়েছিল তাঁর। দুর্নীতি বিতর্কে নাম জড়িয়েছে ছেলে পার্থ পাওয়ারেরও। অন্যদিকে তাঁর পরিবারের স্ত্রী-সহ অন্যান্য সদস্যরাও জড়িয়েছেন ভোটের রাজনীতিতে। তবে দীর্ঘ রাজনীতির সময়কালে একাধিক বিতর্ক, বিশ্বাসঘাতকতার তকমা পেলেও, অজিত পাওয়ার মুম্বইয়ের বুকে সাহেব হতে চাননি বুঝি বা। রাজনীতির কেন্দ্র অনুযায়ী যেদিকেই ঝুঁকুন না কেন, রয়ে যেতে চেয়েছিলেন অজি দাদা হয়েই।
ইদানিং মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে আবার কান পাতলেই শোনা যাচ্ছিল, ঠাকরে ব্রাদার্স রিটার্নসের, মুম্বইয়ের স্বার্থে ফের একজোট হবেন, কাকা-ভাইপো। ভাইপো নাকি দেখাও করতে চেয়েছিলেন কাকার সঙ্গে। সেই সাক্ষাৎ হল না। রাজনীতির উত্থানের যে বারামতির মাটি থেকে, সেখানে যাওয়ার পথেই, ভেঙে পড়ল বিমান। ভাঙল পাওয়ার হাউসের দেওয়াল।
