আজকাল ওয়েবডেস্ক: রাজধানীর অভিজাত কূটনৈতিক পাড়া, সরকারি দপ্তর আর সুসজ্জিত অ্যাভিনিউয়ের মাঝখানেই দশকের পর দশক ধরে টিকে আছে তিনটি ঝুগ্গি কলোনি—বিআর ক্যাম্প, মসজিদ ক্যাম্প ও ডিআইডি ক্যাম্প। সবক’টি এক কিলোমিটারের মধ্যেই, দিল্লির অন্তরে। বৃহস্পতিবার আচমকাই এই তিন কলোনির বাসিন্দাদের হাতে পৌঁছেছে উচ্ছেদ নোটিস। ৬ মার্চের মধ্যে ঘর খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নতুন বাস ভবন হবে তাই এলাকা 'সাফ' করার জন্য এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়া।
শুক্রবার ডিআইডি ক্যাম্পে গিয়ে দেখা গেল, বাসিন্দাদের মুখে একটাই প্রশ্ন—“এখন কোথায় যাব?” চল্লিশোর্ধ্ব সুনীতা দেবী, যিনি আশপাশের অভিজাত বাংলোতে গৃহকর্মীর কাজ করেন, বললেন, “১০-১৫ কিলোমিটার হলে মানা যেত, কিন্তু ৪৫ কিলোমিটার দূরে গিয়ে কীভাবে সংসার চালাব?”
বাসিন্দাদের দাবি, কেন্দ্রীয় আবাসন ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রকের অধীন ল্যান্ড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস (এলঅ্যান্ডডিও) বৃহস্পতিবার নোটিস দেয়। তাতে জানানো হয়, উত্তর-পশ্চিম দিল্লির সাভদা ঘেভরায় বরাদ্দ হওয়া ফ্ল্যাটে যেতে হবে। দূরত্ব প্রায় ৪৫ কিলোমিটার।
গুড্ডু আনসারি, যিনি ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে এখানে আছেন বলে দাবি করেন, বলেন, “আমরা ইংরেজি জানি না। একটা সই করলেই সব ভুল হয়ে যেতে পারে, তবু করেছি।” তাঁর মতো আরও অনেকে না বুঝেই কাগজে সই করেছেন বলে অভিযোগ।
বাসিন্দারা জানান, জানুয়ারি ২০২৪ থেকেই বিভিন্ন সময় প্রশাসনের আধিকারিকরা আসছেন। তখন ‘সার্ভে’ করা হয়, কতজন মানুষ এখানে থাকেন তা জানার জন্য। এবার সোমবার আবার আধিকারিকরা এসে পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবেন বলে জানানো হয়েছে।
ফ্ল্যাটের মালিকানা পেতে মাসে ৫,০০০ টাকা করে কিস্তি দিতে হবে বলে জানানো হয়েছে। কিন্তু নতুন জায়গায় কাজের সুযোগ কী হবে, তা স্পষ্ট নয়। ডিআইডি ক্যাম্পের বাইরে মোমো বিক্রি করা সোনু যাদবের প্রশ্ন, “এখানে বিক্রি হয়। ওখানে কে কিনবে আমার মোমো?”
অনেক মহিলা আশপাশের কূটনৈতিক বা সরকারি বাংলোয় গৃহকর্মীর কাজ করেন। পুরুষদের কেউ কেউ রেসকোর্সে ঘোড়ার পরিচর্যা বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অস্থায়ী শ্রমিকের কাজ করেন। বাসিন্দাদের মতে, টিনের ছাউনি আর কাঁচা দেওয়াল হলেও, এখানকার উপার্জন তুলনামূলক ভালো—কারণ পাশেই অভিজাত এলাকা।
এই ক্যাম্পগুলির বহু শিশুই কেন্দ্রীয় দিল্লির বিভিন্ন স্কুলে পড়ে—নভ্যুগ স্কুল, এয়ার ফোর্স স্কুল, লায়ন্স বিদ্যা মন্দির ও এনডিএমসি পরিচালিত আরও কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, যা মন্দির মার্গ ও অশোকা হোটেল চত্বরে অবস্থিত।
৬৪ বছরের মদনলাল স্মৃতি রোমন্থন করে বলেন, ১৯৪০-৫০-এর দশকে এই এলাকা ছিল প্রায় জঙ্গল, ক’টি ঘোড়াশালা ছাড়া কিছুই ছিল না। “রাজেশ খান্না এমপি থাকার সময় জলসংযোগ পাই,” বললেন তিনি। রাজধানী যত বেড়েছে, ততই বেড়েছে এই বসতিও। উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন 7, Lok Kalyan Marg এই ঝুগ্গি কলোনিগুলির থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরেই।
২৯ অক্টোবর ২০২৫-এ পুনর্বাসনের নোটিস জারি হয়। নভেম্বর মাসে তা দিল্লি হাই কোর্টে চ্যালেঞ্জ করা হয়। ১৩ নভেম্বর ২০২৫-এ আদালত অন্তর্বর্তী নির্দেশে জানায়, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে বাসিন্দাদের উচ্ছেদ করা যাবে না। ১৩ জানুয়ারির শুনানিতে সরকার আরও চার সপ্তাহ সময় চায়। আদালত মামলাটি ১৩ মে তালিকাভুক্ত করে এবং জানায়, ততদিন পর্যন্ত আগের অন্তর্বর্তী নির্দেশ বলবৎ থাকবে।
দিল্লির অভিজাত পরিসরের ছায়াতেই টিকে থাকা এই তিন ঝুগ্গি কলোনির ভবিষ্যৎ এখন আদালতের রায় ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। তবে বাসিন্দাদের কাছে প্রশ্ন একটাই—দশকের পর দশক ধরে গড়ে ওঠা সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে দূরে গিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করা কতটা সম্ভব?
