পর্তুগালের জালে বল জড়িয়ে ইয়োয়ানে উইসা শুধু গোলই করেননি, তিনি লিখেছেন ইতিহাস। আর্থার মাসুয়াকুর ক্রস থেকে করা সেই গোলেই ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর পর্তুগালের বিরুদ্ধে ১-১ গোলে ড্র করে ডিআর কঙ্গো।
2
17
বিশ্বকাপে ডিআর কঙ্গোর প্রথম গোলের অপেক্ষার অবসান অবশেষে ঘটে। ১৯৭৪ সালে জাইরে নামে প্রথমবার বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার পর টানা ৫২ বছর কোনও গোল করতে পারেনি দেশটি। ফলে উইসার এই গোল শুধু সমতা ফেরানোর গোল নয়, বরং একটি জাতির দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসানের প্রতীক।
3
17
তবে উইসার এই সাফল্যের পিছনে লুকিয়ে রয়েছে এক ভয়াবহ লড়াইয়ের গল্প।
4
17
২০২১ সালের জুলাইয়ে, ফরাসি ক্লাব লরিয়ঁর হয়ে দুর্দান্ত ফর্মে ছিলেন ২৪ বছর বয়সী উইসা। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব ব্রেন্টফোর্ডে প্রায় ৮.৫ মিলিয়ন পাউন্ড চুক্তিতে যোগ দেওয়া একপ্রকার নিশ্চিত, হঠাৎই তখন তাঁর জীবন ওলটপালট হয়ে যায়।
5
17
এক মহিলা ভক্ত সেজে তাঁর বাড়িতে এসে অটোগ্রাফ চান। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই ওই মহিলা উইসার মুখে ছুড়ে মারেন একধরনের রাসায়নিক পদার্থ। পরে তদন্তে জানা যায়, তাঁর ছোট মেয়েকে অপহরণের পরিকল্পনা থেকেই এই হামলা চালানো হয়েছিল।
6
17
ভয়াবহ সেই হামলায় উইসার দুই চোখ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তাঁকে অস্ত্রোপচার করতে হয়। আদালতে দেওয়া সাক্ষ্যে তিনি বলেন, ''দরজা খোলার পরই আমার মুখে তরল পদার্থ ছুড়ে মারা হয়। আমি চিৎকার করছিলাম, শ্বাস নিতে পারছিলাম না। চোখ ধোয়ার জন্য প্রতি ঘণ্টায় কাউকে এসে সাহায্য করতে হতো। দুঃস্বপ্নের মতো ছিল ব্যাপারটা।''
7
17
চিকিৎসকরা তাঁকে জানান, অল্পের জন্য তিনি সম্পূর্ণ দৃষ্টিশক্তি হারানো থেকে রক্ষা পেয়েছেন। জীবনের বাকি সময় তাঁকে নিয়মিত চোখের ড্রপ ব্যবহার করতে হবে।
8
17
সেই কঠিন সময়ের কথা স্মরণ করে উইসা বলেন, ''হামলার পর আমি একজন ফুটবলারের চেয়ে একজন বাবা হিসেবেই বেশি ভাবছিলাম। আমি নিজেকে বলেছিলাম, অন্তত আমার সন্তানরা নিরাপদ আছে, যদিও আমি অন্ধ হয়ে গিয়েছি।''
9
17
হামলার কারণে ব্রেন্টফোর্ডে তাঁর স্বপ্নের যাত্রা বিলম্বিত হয়। পুরো প্রাক-মরশুম তিনি মিস করেন। শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েছিলেন। জোরে শব্দ হলে আতঙ্কিত হয়ে পড়তেন। অপরিচিত মানুষের আশপাশে থাকতে পারতেন না।
10
17
মুখের দাগ মুছে ফেলতে কসমেটিক সার্জারির প্রস্তাব দেওয়া হলেও তা প্রত্যাখ্যান করেন উইসা। তার ভাষায়, ''এই দাগ আমার জীবনের ইতিহাসের অংশ।''
11
17
তবে অবিশ্বাস্য মানসিক দৃঢ়তায় ঘুরে দাঁড়ান তিনি। ধীরে ধীরে ব্রেন্টফোর্ডের অন্যতম ভরসাযোগ্য খেলোয়াড়ে পরিণত হন এবং চার মরশুমে ৪৫টি গোল করেন।
12
17
তাঁর দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পুরস্কার হিসেবে ২০২৫ সালে ৫৫ মিলিয়ন পাউন্ডে নিউক্যাসল ইউনাইটেডে যোগ দেন তিনি। ক্লাবের ঐতিহ্যবাহী ৯ নম্বর জার্সিও তুলে দেওয়া হয় তাঁকে। যদিও হাঁটুর চোটে প্রথম মরশুমটা ভাল যায়নি। তবুও হাল ছাড়েননি উইসা।
13
17
সুস্থ হয়ে ফিরে এসে ডিআর কঙ্গোকে ২০২৬ বিশ্বকাপের প্লে-অফ পেরিয়ে মূল পর্বে জায়গা করে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।
14
17
সুস্থ হয়ে ফিরে এসে ডিআর কঙ্গোকে ২০২৬ বিশ্বকাপের প্লে-অফ পেরিয়ে মূল পর্বে জায়গা করে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।
15
17
আর পর্তুগালের বিরুদ্ধে সেই ঐতিহাসিক ম্যাচে আবারও দেখা গেল তাঁর অদম্য মানসিক শক্তি। ইউরোপের তারকাখচিত রক্ষণভাগের বিরুদ্ধে একাই লড়াই করে সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় উপস্থিত হয়ে জাল খুঁজে নেন তিনি।
16
17
ইয়োয়ানে উইসার জন্য হিউস্টনের সেই হেডটি ছিল শুধুমাত্র একটি গোল নয়। এটি ছিল অন্ধকারকে জয় করার গল্প, জীবনসংগ্রামের প্রতীক এবং এমন এক মানুষের প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা, যিনি একসময় প্রায় হারিয়ে ফেলেছিলেন নিজের দৃষ্টিশক্তি, কেরিয়ার এবং পরিবারের নিরাপত্তা।
17
17
বিশ্বকাপের মঞ্চে তাঁর সেই গোল তাই ফুটবল ইতিহাসের পাশাপাশি মানবিক সাহস ও অদম্য ইচ্ছাশক্তিরও এক অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে।