প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আটক করার পরেই ভেনেজুয়েলা আবারও বিশ্বব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রে। দেশটিতে বিশ্বের বৃহত্তম তেলের মজুদ রয়েছে। এখানে পেট্রল জলের চেয়েও সস্তা। প্রকৃতপক্ষে, পাঁচ লিটার পেট্রলের দাম প্রায় এক লিটার জলের বোতলের দামের সমান। এমনকি দুধের দামও যথেষ্ট বেশি।
2
13
২০২১ সালের মধ্যে অতি মুদ্রাস্ফীতির কারণে ভেনেজুয়েলার মুদ্রা, বলিভার, প্রায় মূল্যহীন হয়ে পড়েছিল। এক কেজি মুরগি বা এমনকি টয়লেট পেপারের মতো সাধারণ জিনিসপত্র কেনার জন্য নাগরিকদের প্রায়শই ব্যাগে ভর্তি করে টাকার নিয়ে যেতে হত। ২০২১ সালের আগস্টে দৈনন্দিন লেনদেন সহজ করার জন্য সরকার বাধ্য হয়ে মুদ্রা থেকে ছয়টি শূন্য বাদ দেয়। ২০২১ সালে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিতে মার্কিন ডলারের প্রবেশ। জাতীয় মুদ্রার পতনের ফলে সরকার ডলার লেনদেনের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে।
3
13
২০২১ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, জনসংখ্যার প্রায় ৯৪ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নীচে বসবাস করছিল। অনেক ভেনিজুয়েলাবাসী আবর্জনার স্তূপ থেকে ফেলে দেওয়া খাবার খুঁজতে বাধ্য হয়েছিল। তত দিনে আনুমানিক ৫০ থেকে ৬০ লক্ষ নাগরিক দেশ ছেড়ে কলম্বিয়া ও ব্রাজিলের মতো প্রতিবেশী দেশগুলিতে আশ্রয় নিয়েছিল।
4
13
ভেনেজুয়েলায় এখন প্যাকেটজাত পানীয় জলের দাম দুধ এবং পেট্রল চেয়েও বেশি। দেশটিতে বর্তমানে এক লিটার পেট্রলের দাম ভারতীয় মুদ্রায় ৪৫.১০ টাকা। এক লিটার দুধের দাম ১৬০.৬০ টাকা, এক লিটার জলের দাম ২২৩.৭০ টাকা এবং এক লিটার রান্নার তেলের দাম ৩১৫ থেকে ৪০৫ টাকার মধ্যে।
5
13
বিশ্লেষকরা বলছেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত স্যানিটেশন ব্যবস্থা ও সরবরাহ শৃঙ্খলকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে। তেলসমৃদ্ধ দেশ হওয়া সত্ত্বেও, বিশুদ্ধ পানীয় জল এখানে সহজলভ্য নয়।
6
13
পেট্রলের দাম কম হলেও, ২০২১ সালে শোধনাগারের ত্রুটি এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে জ্বালানির জন্য সপ্তাহব্যাপী অপেক্ষা করতে হত। হাসির বিষয় হল, বিপুল তেল ভান্ডার থাকা সত্ত্বেও ভেনেজুয়েলাকে ইরান-সহ অন্যান্য দেশ থেকে পেট্রল আমদানি করতে হয়েছিল।
7
13
হুগো শাভেজের মৃত্যুর পর ২০১৩ সালের এপ্রিলে প্রথম ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন নিকোলাস মাদুরো। এরপরে প্রায় ১৩ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকেন। এই সময়ে গভীর অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং ব্যাপক অভিবাসনের মতো পরিস্থিতির সম্মুখীন হন মাদুরো।
8
13
তাঁর শাসনকাল বিতর্কিত বলেই পরিচিত। ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের উভয় নির্বাচনই আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দ্বারা ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছিল। স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার অভাবে অনেক দেশই নির্বাচনগুলির বৈধতা স্বীকার করতে রাজি ছিল না। মাদুরোর বিরুদ্ধে বিরোধীরা এবং বেশ কয়েকটি বিদেশী সরকার নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কারসাজির অভিযোগ এনেছিল।
9
13
মাদুরোর নেতৃত্বে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি লাতিন আমেরিকার অন্যতম সম্ভাবনাময় অর্থনীতি থেকে অন্যতম সমস্যাগ্রস্ত অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। কয়েক দশক ধরে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি তেলের আয়ের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। মাদুরোর শাসনকালে এই নির্ভরতা আরও বেড়ে যায়। কৃষি ও উৎপাদন খাতের মতো অন্যান্য খাতগুলি অবহেলিত হয়েছিল। ২০১০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে যখন বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে যায় এবং বিনিয়োগের অভাবে উৎপাদন পরিকাঠামো ভেঙে পড়ে। তখন রপ্তানি আয়ে ধস নামে। এর ফলে জাতীয় উৎপাদন ও সরকারি সম্পদ সংকুচিত হয়।
10
13
ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল সংস্থা পিডিভিএসএ, একসময় জাতীয় গর্ব ছিল। কিন্তু সেটি ক্রমশ রাজনীতির গ্রাসে চলে আসে। অভিজ্ঞ ব্যবস্থাপকদের বদলে রাজনৈতিক অনুগতদের নিয়োগ করা হয় এবং সংস্থাটিকে তেল-বহির্ভূত সামাজিক কর্মসূচির দায়িত্ব দেওয়া হয়, যা এর পরিচালন ক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়। ফলস্বরূপ, তেল উৎপাদন তীব্রভাবে হ্রাস পায়।
11
13
আধুনিক ইতিহাসে অতিমুদ্রাস্ফীতির অন্যতম চরম একটি পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিল ভেনিজুয়েলা। রাজস্ব কমে যাওয়ায় সরকার ব্যয় মেটাতে বিপুল পরিমাণ মুদ্রা ছাপানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। জিনিসপত্রের দাম আকাশচুম্বী হয়েছিল, মজুরি কমে গিয়েছিল এবং সঞ্চয় উধাও হয়ে গিয়েছিল। যা লক্ষ লক্ষ মানুষকে দারিদ্র্য ও দুর্দশার দিকে ঠেলে দিয়েছিল।
12
13
জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টায় মাদুরোর সরকার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিল। কিন্তু এর ফলে ঘাটতি দেখা দেয় এবং কালবাজারি বৃদ্ধি পায়। জনরোষ ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। ক্ষমতা ধরে রাখতে বল প্রয়োগ করে মাদুরো সরকার। বিরোধী কন্ঠস্বরকে দমনের প্রচেষ্টা করা হয়। সংবাদমাধ্যমের ক্ষমতা খর্ব করা হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলি মাদুরো সরকারের বারবার সমালোচনা করেছিল।
13
13
ভেনেজুয়েলার সঙ্কটের চরম পর্যায়ে খাদ্য, নিরাপত্তা ও সুযোগের সন্ধানে ৭০ লক্ষেরও বেশি নাগরিক বিদেশে পালিয়ে গিয়েছিলেন। মাদুরো এই দেশত্যাগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে, মাদুরোর শাসনকাল ভেনেজুয়েলাকে একটি গভীর সমস্যাগ্রস্ত রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল। যেখানে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা বা জনগণের কল্যাণের উন্নতির পরিবর্তে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য জাতীয় সম্পদকে ভিন্ন খাতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।