দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সামনে একটি বড় প্রশ্ন ছিল—সূর্যে কি সত্যিই রুপোর ঘাটতি রয়েছে? কারণ, বিজ্ঞানীদের ধারণা অনুযায়ী সূর্য, গ্রহ, গ্রহাণু এবং উল্কাপিণ্ড—সবই প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন বছর আগে একই গ্যাস ও ধূলিকণার বিশাল মেঘ থেকে তৈরি হয়েছিল।
2
12
তাই তাদের মধ্যে ভারী মৌলগুলির অনুপাতও প্রায় একই হওয়ার কথা। কিন্তু পর্যবেক্ষণে দেখা গিয়েছিল, উল্কাপিণ্ডের তুলনায় সূর্যে রুপোর পরিমাণ অনেক কম। এই অমিলই বহু বছর ধরে বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করে রেখেছিল।
3
12
অবশেষে সেই রহস্যের সমাধান হয়েছে। সুইডেনের উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সেমা চালিশকান এবং তাঁর গবেষক দল দেখিয়েছেন, সূর্য থেকে রুপো হারিয়ে যায়নি। বরং এতদিন বিজ্ঞানীরা যে পদ্ধতিতে সূর্যের রুপোর পরিমাণ পরিমাপ করছিলেন, সেই পদ্ধতিতেই ছিল ত্রুটি।
4
12
কোনও নক্ষত্রে কী কী মৌল রয়েছে, তা জানার জন্য বিজ্ঞানীরা সেই নক্ষত্রের আলোর বর্ণালী বিশ্লেষণ করেন। সূর্যের আলো যখন তার বাইরের স্তর অতিক্রম করে, তখন বিভিন্ন মৌলের পরমাণু নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো শোষণ করে।
5
12
প্রতিটি মৌলের এই রেখার বিন্যাস আলাদা, ঠিক মানুষের আঙুলের ছাপের মতো। এই রেখাগুলি বিশ্লেষণ করেই বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন সূর্যে কোন মৌল কত পরিমাণে রয়েছে।
6
12
এতদিন সূর্যের বায়ুমণ্ডলের যে মডেল ব্যবহার করে রুপোর পরিমাণ নির্ণয় করা হচ্ছিল, তা ছিল অনেকটাই সরলীকৃত। কিন্তু বাস্তবে সূর্যের বাইরের স্তর অত্যন্ত অস্থির ও গতিশীল। সেখানে তাপ, গ্যাসের প্রবাহ এবং আলো-পরমাণুর পারস্পরিক ক্রিয়া অত্যন্ত জটিল।
7
12
সেমা চালিশকানের দল একটি নতুন ও আরও বাস্তবসম্মত কম্পিউটার মডেল তৈরি করে। এই মডেলে সূর্যের বাইরের স্তরের অস্থিরতা, আলোর প্রভাব এবং রুপোর পরমাণুর আচরণ অনেক বেশি নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
8
12
নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, সূর্যে রুপোর পরিমাণ আগের ধারণার তুলনায় প্রায় ৫৫ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ সূর্যে রুপোর কোনও অস্বাভাবিক ঘাটতি ছিল না। বরং আগের পরিমাপই ভুল ছিল।
9
12
এই আবিষ্কারের ফলে সূর্যের রাসায়নিক গঠন এখন উল্কাপিণ্ডের সঙ্গে অনেক বেশি মিল পাচ্ছে। ফলে সৌরজগতের উৎপত্তি সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের ধারণাও আরও শক্তিশালী ভিত্তি পেল।
10
12
গবেষকরা এখন শুধু সূর্যেই থেমে থাকতে চান না। তাঁদের লক্ষ্য, একই উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে আকাশগঙ্গার অন্যান্য নক্ষত্রেও রুপো এবং অন্যান্য ভারী মৌলের পরিমাণ পরীক্ষা করা।
11
12
বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, এর মাধ্যমে জানা যাবে মহাবিশ্বে রুপো, সোনা ও অন্যান্য ভারী মৌল ঠিক কোথায় এবং কীভাবে তৈরি হয়েছিল। পাশাপাশি এই মৌলগুলি কীভাবে বিভিন্ন নক্ষত্র ও গ্রহে ছড়িয়ে পড়েছে, সেই রহস্যও উন্মোচিত হতে পারে।
12
12
বিশেষজ্ঞদের মতে, সূর্যের "হারিয়ে যাওয়া রুপো"-র রহস্যের সমাধান শুধু একটি বৈজ্ঞানিক ধাঁধার উত্তর নয়, বরং সৌরজগতের সৃষ্টি এবং মহাবিশ্বে ভারী মৌলের উৎপত্তি সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানকে আরও সমৃদ্ধ করবে।