উত্তরপ্রদেশের গৌতম বুদ্ধ নগর জেলার জেওয়ারের কাছে নির্মাণ হচ্ছে ভারতের বৃহত্তম বিমানবন্দরের। নাম নয়ডা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বা জেওয়ার বিমানবন্দর।
2
18
প্রাথমিক পর্যায়ে বার্ষিক ১.২০ কোটি যাত্রী পরিচালনার জন্য বিমানবন্দরটি তৈরি হচ্ছে। ২০৫০ সালের মধ্যে এটি বার্ষিক ৬-১২ কোটি যাত্রীকে পরিচালনা করতে সক্ষম হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
3
18
জেওয়ারে যখন বিমানবন্দরের কাজ শুরু হয় তখন স্থানীয় কৃষকদের ১২,০০০ একর উর্বর জমি ছেড়ে দিতে হয়েছিল। বিনিময়ে তাদের কোটি কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছিল। অনেক পরিবারই কখনও এই বিপুল টাকা একেবারে চোখে দেখেননি।
4
18
কোটি কোটি টাকা হাতে পেয়েই জীবনযাত্রায় আচমকা পরিবর্তন চলে আসে। জমির পরিবর্তে বাড়ি তৈরি হয়। ট্র্যাক্টরের পরিবর্তে প্রতিটি বাড়িতে ঢুকে পড়ে গাড়ি। সাধারণ ফোনের পরিবর্তে আইফোন।
5
18
জেওয়ারের গ্রামগুলির জীবন আমূল রূপান্তরিত হয়ে যায়। কিন্তু বিমানবন্দরের উদ্বোধনের ঠিক আগে, সেই উজ্জ্বলতা কিছুটা নিষ্প্রভ। কৃষকদের হাল তুলে ধরা হয়েছে সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে-র প্রতিবেদনে।
6
18
স্থানীয় এক কৃষকের সন্তান জানিয়েছেন, কয়েক বছর আগে ক্ষতিপূরণের টাকা ঢুকতেই ৯০ হাজার টাকা দিয়ে আইফোন কিনে ফেলেছিলাম। এখন সেই ফোন সারাই করার পয়সা নেই। ভাঙা স্ক্রিন নিয়েই কাজ চালাতে হচ্ছে। চার্জার কেনারও টাকা নেই।
7
18
অপর এক কৃষক ইসমাইল খান টাকা পেয়েই বিলাসবহুল এসইউভি কিনে নিয়েছিলেন। সেই গাড়ি চড়েই মাঠেঘাটে যেতেন। কিন্তু এখন আর তেল কেনার টাকা নেই। ইসমাইল বলেন, “আমরা গাড়ি চড়ে মাঠে ঘুরতে যেতাম। কিন্তু এখন আর আমাদের কাছে পেট্রলের কেনার টাকাও অবশিষ্ট নেই।’’
8
18
ইসমাইল জানিয়েছেন, টাকা হাতে পেয়ে আরও একটি জিনিস কিনেছিলেন। একটি আইফোন ১১ প্রো ম্যাক্স। লক্ষাধিক টাকার সেই ফোন এখন বিক্রি করে দিতে হয়েছে তাঁকে। পরিবর্তে কিনেছেন একটি সস্তা অ্যান্ড্রয়েড ফোন। সেটি দিয়েই কোনও ভাবে কাজ চালাচ্ছেন।
9
18
বিপরীত উদাহরণও আছে। টাকার সদ্ব্যাবহার করেছেন ঠাকুর ধরমপাল সিং। তিনি বুদ্ধিমানের মতো বিনিয়োগ করেছিলেন। তা কয়েক বছরে বহুগুণ বেড়েছে। তাঁর প্রাপ্য ক্ষতিপূরণই এখন তাঁর মূলধন হয়ে উঠেছে। তিনি জানিয়েছেন, এখন তিনি দুধ বিক্রি করেন এবং একটি ব্যবসা চালান। ধরমপাল বলেন, “আমার এখন দু’টি গাড়ি রয়েছে। ভগবানের আশীর্বাদে আমি খুশি।”
10
18
জেওয়ারেই তিন কোটিরও বেশি টাকা দিয়ে বাড়ি বানিয়েছেন ধরমপাল। সেই বাড়ির অন্দরসজ্জা বিলাসবহুল হোটেলের মতো। মার্বেলের মেঝে, আড়ম্বরপূর্ণ বসার ঘর, আধুনিক চিমনি দিয়ে সজ্জিত রান্নাঘর— কী নেই সেখানে!
11
18
কিন্তু একই কলোনির অন্য একটি অংশে, ছবি সম্পূর্ণ আলাদা। পাড়ার পার্কে উপস্থিত ৫০ জনেরও বেশি পুরুষ জুয়া খেলছিলেন। তাঁরা কোটি কোটি টাকা ক্ষতিপূরণও পেয়েছিল। কিন্তু অনেকেরই সঞ্চয় শেষ হয়ে গেছে।
12
18
রোজই তাঁরা ওই পার্কে আসেন। তাঁদের মধ্যে কেউ এমএ পাশ, কেউ বা বি. টেক পাশ করে চাকরি করা যুবক। ক্ষতিপূরণের টাকা পেয়েই সব ছেড়ে দিয়েছিলেন। এখন তাঁরা অনেকেই বেকার। অনেকে মদ্যপান, অলসতা এবং জুয়ার শিকার। জমানো টাকা ভাঙিয়ে কোনও মতে সংসার চলছে তাঁদের।
13
18
২০১৮ সালে জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার প্রথম পর্যায়ে কৃষকদের প্রতি বিঘায় প্রায় ২০ লক্ষ টাকা দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে চতুর্থ পর্যায়ে, এই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে প্রায় ৪০ লক্ষ টাকায় পৌঁছেছে।
14
18
অধিগ্রহণের প্রাথমিক পর্যায়ে জমি বিক্রি করে দেওয়া অনেক কৃষক এখন অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ দাবি করছেন। তাঁরা যুক্তি দিচ্ছেন যে প্রাথমিক পর্যায়ে দেওয়া টাকা এখন তাঁদের জীবিকা নির্বাহের জন্য যথেষ্ট নয়।
15
18
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে, জমি ছিল কৃষকদের একমাত্র স্থায়ী সম্পদ। যা খাদ্য, আয় এবং নিরাপত্তা প্রদান করত। ক্ষতিপূরণ সেই সম্পদের পরিবর্তে এককালীন অর্থ প্রদান করেছিল। কিন্তু সেই অর্থ অনেকেই দু’হাতে উড়িয়ে দিয়েছেন।
16
18
স্থানীয় প্রশাসন স্বীকার করেছে যে এই বিষয়ে তাঁদের ভূমিকা সীমিত। জেওয়ারের বিধায়ক ধীরেন্দ্র সিং বলেন, “সরকার কৃষকদের তাঁদের জমির জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে পারে, কিন্তু তাঁরা কীভাবে সেই অর্থ ব্যয় করবেন তা তাঁদের নিজস্ব ব্যাপার।”
17
18
আর্থিক বিশেষজ্ঞ ওমেশ সেহগাল জানিয়েছেন, মানুষ ৩০-৪০ বছর আগে যে বিলাসবহুল জিনিসপত্রের কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারত না, তা কেনার টাকা হাতে চলে এলে দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে যাওয়া স্বাভাবিক। মানুষকে তাদের অর্থ বুদ্ধি করে বিনিয়োগ করতে হবে। আমরা শুধু পরামর্শ দিতে পারি। মানুষকে তাঁদের অর্থ বুদ্ধিমানের মতো ব্যবহার করতে বলা এবং সচেতনতামূলক প্রচার চালানো ইত্যাদি। বিডিও বা এসডিও-রা গ্রামে গিয়ে পরামর্শ দিতে পারেন।
18
18
জেওয়ার একটি কঠিন সত্য প্রকাশ করেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষকরা কোটি কোটি টাকা পেয়েছিলেন। অনেক পরিবারের হাত থেকে সেই টাকা উধাও হয়ে গিয়েছে। স্বেচ্ছায়, দ্রুত এবং কোনও পরিকল্পনা ছাড়াই ব্যয়ের ফলেই তা হয়েছে। যারা পরিকল্পনা, বিনিয়োগ এবং বৈচিত্র্য এনেছেন তাঁরা এগিয়ে গিয়েছেন।