কোনও বাড়িতেই কেউ রান্না করেন না, একাকীত্ব দূর করতে বিকল্প হেঁশেলেই সুখী ভারতের এই গ্রাম
নিজস্ব সংবাদদাতা
২ মে ২০২৬ ১২ : ৪০
শেয়ার করুন
1
11
গুজরাটের ছোট একটি গ্রাম চান্দনকি। ভোর হয়, সূর্যের আলো এসে পড়ে গ্রামের সরু রাস্তাগুলোর বাঁকে বাঁকে, মানুষজন ঘুম থেকে ওঠে কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়— কোথাও উনুন জ্বলে না, হাঁড়িতে ভাত ফোটার গন্ধ ভেসে বেড়ায় না বাতাসে৷
2
11
গুজরাটের মেহসানা জেলার এই ছোট্ট গ্রামটিতে রান্নাঘরগুলি শব্দহীন৷ নীরবতার মধ্যেই আছে জীবনের এমন এক গল্প, যা শিখিয়ে দিচ্ছে বেঁচে থাকার নতুন মন্ত্র৷
3
11
একসময় ১,১০০ জন মানুষের বসতি ছিল এই গ্রামে৷ কিন্তু সময়ের স্রোতে বদলে গেছে ছবিটা। গ্রামের প্রায় ৩০০ জন এখন বিদেশে— আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়ায়। আরও ৬০০-৭০০ জন পাড়ি জমিয়েছেন আহমেদাবাদসহ অন্যান্য শহরে, ভালো কাজের সন্ধানে। পড়ে আছেন কেবল প্রবীণরা— বেশিরভাগেরই বয়স সত্তর থেকে আশির কোঠায়।
4
11
গ্রামের সকলে শিক্ষিত, টাকাপয়সার অভাব নেই৷ অভাব কেবল মানুষের৷ গ্রামের প্রবীণা মহিলারা, যাঁদের অনেকেই নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন, রান্নাঘরের এই নিত্যদিনের যুদ্ধে ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলেন। ঠিক তখনই গ্রামবাসীরা মিলে নিলেন এক অভিনব সিদ্ধান্ত— গড়ে তোলা হবে একটি ‘কমিউনিটি কিচেন’, গোটা গ্রামের জন্য একটি পারিবারিক হেঁশেল।
5
11
মাসে মাত্র ২,৫০০ টাকার বিনিময়ে গ্রামের যে কোনো বাসিন্দা পাচ্ছেন রোজ দু’বেলার গরম, পুষ্টিকর খাবার। সৌরবিদ্যুতে চলা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত একটি হলঘরে দুপুর দেড়টায় বাজে দুপুরের খাবারের ঘণ্টা। বাসন-পেতে বসে যান গ্রামের মুরুব্বিরা।
6
11
মেনুতে থাকে গরম গরম ভাকরি, গুজরাটি ডাল, মরসুমি সবজি, আর শেষপাতে— যা ছাড়া গুজরাটি খাওয়া অসম্পূর্ণ— এক গ্লাস ঠান্ডা ঘোল। ঘরের রান্নার মতোই স্বাদ। কথাটায় শুধু খাবারের প্রশংসা নেই, আছে এক অদ্ভুত আশ্রয়ের ইঙ্গিত।
7
11
স্বাস্থ্যবিধির প্রশ্নে হেঁশেলের দায়িত্বে থাকা এক ব্যক্তি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “এঁরা সবাই বয়স্ক, রোগ-ব্যাধির ঝুঁকি। তাই পরিচ্ছন্নতা সব কিছুর আগে৷ ভাতের মধ্যে কাজু দেওয়ার সময় যদি দু’টো কাজু মাটিতে পড়ে যায়, সেগুলো আর রান্নায় ব্যবহার করি না। আলু কাটার সময় টুকরো ছিটকে পড়লে ফেলে দিই। এই মানুষগুলো আমাদের নিজেদের পরিবারের লোকের মতোই।”
8
11
খাবারের পাত নয়, এ এক যাপনের মঞ্চ। প্রতিটি খাবারের পাত এখানে আসলে গল্পের আসর। নাতি-নাতনিদের ছবি দেখানো, ছেলের ফোনের কথা শোনানো, পুরনো দিনের স্মৃতিচারণ— সব মিলেমিশে যায় ডাল-ভাতের মতো।
9
11
যে নিঃসঙ্গতা একদিন গ্রাস করতে চেয়েছিল গোটা গ্রামটাকে, সেই নিঃসঙ্গতাই হার মেনেছে একটা হেঁশেলের কাছে।
10
11
যেখানে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বাড়ছে দিনদিন, সন্তানরা চাকরির খোঁজে দূরে দূরে ছড়িয়ে পড়ছেন— সেখানে চান্দনকি দেখাচ্ছে এক বিকল্প পথ।
11
11
জটিল কোনো সরকারি নীতি নয়, কোনো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নয়— শুধু পরস্পরের প্রতি দায়বদ্ধতা আর একটু ভালোবাসা থাকলেই গড়ে তোলা যায় এমন একটি জনপদ, যেখানে কেউ একা নয়।