বিয়ে কোনও নাচ-গান বা আমোদ-প্রমোদের উৎসব কিংবা নিছক কোনও বাণিজ্যিক চুক্তি নয়। যদি ধর্মীয় রীতি মেনে 'সপ্তপদী' বা সাতপাক না সম্পন্ন হয়, তবে কেবল আইনি রেজিস্ট্রেশন বা ম্যারেজ সার্টিফিকেট দিয়ে একটি হিন্দু বিয়েকে বৈধ বলা যাবে না। এক প্রবাসী ভারতীয় যুবকের করা মামলায় গত ২৩ জুন এমনই এক ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ রায় দিয়েছে গুজরাট হাইকোর্ট, যার পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি ২৯ জুন প্রকাশ পেয়েছে।
2
6
বিচারপতি ইলেশ ভোরা এবং বিচারপতি আর. টি. বাচ্ছানির ডিভিশন বেঞ্চ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, হিন্দু ধর্মে বিয়ে একটি ‘সংস্কার’ বা পবিত্র বন্ধন। ভৌগোলিক বা সাংস্কৃতিক কারণে নিয়মকানুনের কিছুটা হেরফের হতেই পারে, কিন্তু পবিত্র অগ্নির সামনে বর-কনের একসাথে সাত পা ফেলার মতো অত্যাবশ্যকীয় আচারগুলোই হল হিন্দু বিয়ের মূল ভিত্তি। এই আচারগুলোই একটি দাম্পত্য সম্পর্ককে আধ্যাত্মিক, সামাজিক এবং আইনি স্বীকৃতি দেয়।
3
6
মামলাটি করেছিলেন যুক্তরাজ্য প্রবাসী কৌশিক সোনার নামের এক যুবক। তিনি জানান, আহমেদাবাদের এক তরুণী হঠাৎ তাঁর বাবা-মায়ের কাছে গিয়ে একটি ম্যারেজ সার্টিফিকেট দেখিয়ে দাবি করেন যে তিনি কৌশিকের আইনসম্মত স্ত্রী। কৌশিক আদালতে জানান, তিনি কোনওদিন ওই তরুণীকে বিয়ে করেননি, কোনও সামাজিক বা ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানও হয়নি এবং তাঁরা কখনো স্বামী-স্ত্রী হিসেবে বসবাসও করেননি।
4
6
তাঁর অভিযোগ ছিল, জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে এবং তাঁর অজান্তেই বিয়ের কাগজে সই করিয়ে নেওয়া হয়েছিল। আহমেদাবাদের ফ্যামিলি কোর্ট প্রথমে যুবকের এই বিয়ে বাতিলের আবেদন খারিজ করে দিয়েছিল। কিন্তু গুজরাট হাইকোর্টে শুনানির সময় ওই তরুণী নিজেই স্বীকার করেন যে, তাঁদের মধ্যে কোনও ধর্মীয় আচার বা বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা হয়নি এবং তাঁরা কখনো স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কও ভাগ করেননি। এরপরই হাইকোর্ট ফ্যামিলি কোর্টের আগের আদেশ বাতিল করে এই বিয়েকে সম্পূর্ণ অবৈধ ও ‘শূন্য’ বলে ঘোষণা করে।
5
6
হাইকোর্ট তার রায়ে হিন্দু বিবাহ আইনের ৭ নম্বর ধারার উল্লেখ করেছে। এই ধারা অনুযায়ী, প্রথাগত রীতিনীতি এবং বিশেষ করে সপ্তপদী ছাড়া একটি হিন্দু বিয়ে আইনিভাবে পূর্ণাঙ্গ বা বাধ্যতামূলক হতে পারে না। যেহেতু এই মামলায় কোনও আচারই পালন করা হয়নি, তাই বিয়ের মূল ভিত্তিটাই এখানে অনুপস্থিত। আদালত এই রায়ের মাধ্যমে আধুনিক সমাজের তরুণ-তরুণীদের উদ্দেশ্যে একটি গভীর সামাজিক বার্তাও দিয়েছে।
6
6
রায়ে বলা হয়েছে, হিন্দু ঐতিহ্যে স্ত্রীকে স্বামীর 'অর্ধাঙ্গিনী' বা অর্ধাংশ হিসেবে দেখা হয়, যিনি একই সাথে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয়ে উজ্জ্বল এবং সংসারে সমান অংশীদার। বিয়ে হল একটি নতুন পরিবারের ভিত্তি। এটি কেবল ‘খাওয়া-দাওয়া আর হুল্লোড়’ করার কোনও উপলক্ষ নয়। হাইকোর্ট আরও মনে করিয়ে দিয়েছে যে, বিয়ে হল দুটি মানুষের মধ্যে একটি আজীবন, মর্যাদাপূর্ণ এবং পারস্পরিক সম্মতির স্বাস্থ্যকর ইউনিয়ন। তাই তরুণ প্রজন্ম যাতে এই পবিত্র বন্ধনে জড়ানোর আগে এর গভীরতা ও সামাজিক গুরুত্ব ভালোভাবে অনুধাবন করে, আদালত সেই আহ্বানও জানিয়েছে।