১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট ভারত স্বাধীনতার স্বাদ পায়। কিন্তু মহাত্মা গান্ধী সেই ঐতিহাসিক দিনে দিল্লিতে আয়োজিত বিশাল উৎসব থেকে অনেক দূরে ছিলেন। জওহরলাল নেহরু যখন মধ্যরাতের সেই বিখ্যাত ভাষণ দিচ্ছিলেন এবং দেশজুড়ে স্বাধীনতা উদযাপন চলছিল, তখন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ছিলেন কলকাতায়। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ক্ষতবিক্ষত শহরে শান্তি ফিরিয়ে আনার কাজে ব্যস্ত ছিলেন মহাত্মা।
2
7
মহাত্মা গান্ধী কলকাতার বেলেঘাটায় ছিলেন। এই অঞ্চল হিন্দু-মুসলিম হিংসার সাক্ষী ছিল। দেশভাগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার কারণেই তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। জওহরলাল নেহরুর মতো নেতারা যখন ঐতিহাসিক উদযাপনের জন্য দিল্লিতে ছিলেন, তখন গান্ধী মনে করতেন সাম্প্রদায়িক উত্তেজনায় জর্জরিত শহরেই তাঁর উপস্থিতি বেশি প্রয়োজন।
3
7
গান্ধীর মূল পরিকল্পনা ছিল পূর্ব বাংলায় যাওয়ার, যেখানে তিনি এর আগে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে শান্তি স্থাপনের জন্য কাজ করেছিলেন। কিন্তু কলকাতার মুসলিম নেতারা তাঁকে শহরে থেকে যাওয়ার এবং হিংসা রোধে সহায়তা করার অনুরোধ জানান। ফলে মহাত্মা গান্ধী আর শেষ পর্যন্ত কলকাতায় থেকে যেতে সম্মত হন।
4
7
এই সময়ে গান্ধীর অন্যতম উল্লেখযোগ্য সহযোগী ছিলেন হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দী, যিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট মুসলিম নেতা এবং বাংলার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী। রাজনৈতিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও তাঁরা একসঙ্গে কাজ করেছেন, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাপূর্ণ এলাকাগুলো পরিদর্শন করেন এবং হিন্দু ও মুসলমানদের শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থানের জন্য উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।
5
7
গান্ধীর কাছে ১৫ই আগস্ট কেবল উৎসবের দিন ছিল না। তিনি চেয়েছিলেন মানুষ যেন দেশভাগের সময় যারা কষ্টে ছিল এবং সেই লক্ষ লক্ষ মানুষের কথা মনে রাখে। অগনিত উদ্বাস্তু সেই সময়ে দেশভাগের ক্ষত বুকে দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটাচ্ছিল। তাঁর স্বাধীনতা দিবস শুরু হয়েছিল ভোরবেলা প্রার্থনার মধ্য দিয়ে। এছাড়া একদল তরুণী বেলাঘাটায় এসে স্বাধীনতা ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান পরিবেশন করেছিল।
6
7
কলকাতার পরিবেশ নাটকীয়ভাবে বদলে গিয়েছিল। ১৫ই আগস্ট শহরের বিভিন্ন প্রান্তে হিন্দু ও মুসলমানরা একত্রিত হয়েছিল এবং শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপন চলছিল। গান্ধীর সঙ্গে থাকা হোরেস আলেকজান্ডার এই পরিবর্তনকে "কলকাতার অলৌকিক ঘটনা" হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। কারণ মাসের পর মাস হিংসর পর শহরটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অভূতপূর্ব সময় প্রত্যক্ষ করেছিল।
7
7
বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষকে একত্রিত করার ওপরই গান্ধীর মূল মনোযোগ ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষ যদি একে অপরের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যায়, তবে ভারতের স্বাধীনতার কোনও অর্থই থাকবে না। তাই ভারতের অন্যান্য স্থানে আয়োজিত উদযাপনের তুলনায় তাঁর স্বাধীনতা দিবস ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি দিল্লিতে আয়োজিত সরকারি অনুষ্ঠানে অংশ নেননি। পরিবর্তে, তিনি দেশভাগের জেরে হিংসার শিকার মানুষদের মাঝে ছিলেন, প্রার্থনা ও উপবাস করেন এবং শান্তি ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন।