১৪ ফেব্রুয়ারি। ভালবাসার দিন। সাল ১৯৯৩।
সেদিন সঞ্জীব দত্ত আকালে ঝরে গিয়েছিলেন কান্নুরের এক ফুটবল মাঠে। চিরদিনের মতো।
2
12
মহাকালের নিয়মে তার পর কেটে গিয়েছে দীর্ঘ ৩৩ বছর। প্রবাহমান গঙ্গায় বয়ে গিয়েছে কত জল। রোজ যেমন বয়ে যায়। বদলে গিয়েছে শহর, বন্দর, জাহাজঘাট, ব্যস্ত রেলস্টেশন।
3
12
কিন্তু সেই সঞ্জীব? তাঁকে যে এখনও কেউ ভোলেনি। নিশুত রাতে আজও যে তাঁকে খুঁজে ফেরে ময়দান।
আজও তিনি সকলের মনের 'রাজা' হয়েই রয়ে গিয়েছেন। সুদূর নীল আকাশে। ওই মেঘের ওপারেই।
4
12
কান্নুরে সন্তোষ ট্রফি খেলতে গিয়ে যে এমন পরিণতি হবে সঞ্জীবের তা কস্মিনকালেও কেউ ভাবেননি। সঞ্জীবের ছোটবেলার বন্ধু হীরালাল দাস যখন স্মৃতির ঝাঁপি খুলছেন, তখন এমন কিছু ঘটনা বেরিয়ে এসেছে, যা শোনার পরে মনে হতেই পারে, মৃত্যু হয়তো বহু আগেই ইঙ্গিত দিয়ে গিয়েছিল সঞ্জীবকে। জানিয়ে দিয়েছিল, সে আসছে। অকালেই টেনে নিয়ে যাবে লড়াকু এক ফুটবলারকে।
5
12
প্রাক্তন ফুটবলার মনোজিৎ দাসের ভাই হীরালালবাবু স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, ''সেবার সন্তোষ ট্রফি খেলতে যাওয়ার আগে আমরা দক্ষিণেশ্বরে পুজো দিতে গিয়েছিলাম। পুজো দেওয়ার পরে সঞ্জীবের হাত থেকে আচমকাই মাটিতে প্রসাদ পড়ে যায়। কোথা থেকে যেন একটা কালো কুকুর এসে সেই প্রসাদ খেয়ে ফেলল।''
6
12
সেদিন ১৪ ফেব্রুয়ারি। সন্তোষ ট্রফির গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল রেলওয়ে ও অন্ধ্রপ্রদেশ। রেলের অধিনায়ক সঞ্জীব। ক্লাস্টার পর্বের শেষ ম্যাচ ছিল। কোচিতে অনুষ্ঠিত মূল পর্বে খেলতে হলে রেলকে ম্যাচটা জিততেই হত। টেনশন ছিল। খেলতে নামার আগে জল ছাড়া কিছু মুখে তোলেননি রেল অধিনায়ক।
7
12
সেই রেল দলে ছিলেন প্রাক্তন কোচ সঞ্জয় সেনও। টাইম মেশিনের সাহায্য না নিয়ে তিনিও ফিরে গিয়েছিলেন সেই বিষণ্ণ দিনে। বলছিলেন, ''খেলতে নামার আগে ড্রেসিং রুমে অন্য কথা বলত সঞ্জীব। সেদিন ও বলে ওঠে ডু অর ডাই।''
8
12
হীরালালবাবুর কথায়, ''জানেন, ও কোনওদিন রামকৃষ্ণদেবের বই পড়ত না। সেদিন হঠাতই রামকৃষ্ণদেবের বই পড়তে শুরু করে। সতীর্থদের নিজের বুট জোড়া তুলে দিয়ে বলে, তোরা নিয়ে নে বুট। আমি তো আর খেলব না। আচ্ছা মৃত্যুকে কি ও জানত? না হলে কেন এমন হল বলুন তো?''
9
12
ওই ম্যাচটায় চরম উত্তেজনা ছিল। শুরু থেকেই চোরাগোপ্তা মারছিলেন অন্ধ্রর ফুটবলাররা। মাঝমাঠের কাছে শূন্যে বল দখলের লড়াইয়ে লাফিয়েছিলেন সঞ্জীব। অন্ধ্রের এক ফুটবলারের সঙ্গে সংঘর্ষে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন রেলের অধিনায়ক। বুকে আঘাত লেগেছিল সঞ্জীবের। তিনি আর ওঠেননি। রেল তখন অরূপ শ্রীমানির গোলে এগিয়ে। মাঠে পড়ে থাকা সঞ্জীবকে দেখার জন্য মাঠের ভিতর ঢুকে পড়েন এক ফিজিও ও সঞ্জয় সেন। তিনি বলছিলেন, ''সেদিন তো আমি প্রথম একাদশে ছিলাম না। রিজার্ভ বেঞ্চে বসেছিলাম। রাজা পড়ে যেতেই আমি মাঠের ভিতরে ছুটে যাই। সেদিন মাঠে অ্যাম্বুল্যান্স ছিল না।''
10
12
সঞ্জয় সেন ও রমেন দাস ট্যাক্সি করে সঞ্জীবকে নিয়ে যান স্থানীয় এক হাসাপাতালে। সেখানে চিকিৎসকরা চেষ্টা করেও বাঁচাতে পারেননি সঞ্জীবকে। চিকিৎসকরা জবাব দিয়ে দেন। ততক্ষণে খেলার শেষ বাঁশি বেজে গিয়েছে।
11
12
রেল অন্ধ্রকে হারিয়ে মূলপর্বে পৌঁছায়। প্লেয়াররা তখন আনন্দ করছেন। কারও মাথাতেই আসেনি যে সঞ্জীব মহাকালের ডাকে তাঁদের ছেড়ে চলে যেতে পারেন। চিরদিনের জন্য। কোন সে মহাসুদূরে। এমন সময়তেই খবর আসে। হীরলালবাবু বলেছিলেন, ''আমরা হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। ওই খবর শোনার পরে সবাই ছুটেত শুরু করে দিই। হাসপাতালে পৌঁছনোর পর দেখি, কাতারে কাতারে মানুষ উপস্থিত।''
12
12
ছেলের পথ বেয়ে মা-ও হারিয়ে গিয়েছেন হাজার তারার ভিড়ে। বাবা তো আগেই চলে গিয়েছিলেন।
দূর আকাশে ছেলের সঙ্গে কোথাও কি আবার দেখা হয়েছে মা-বাবার! হয়তো। সেখানে পরম স্নেহে মা ব্যথাতুর সন্তানের বুকে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। অস্ফুটে বলছেন, ''রাজা, তোর বুঝি খুব কষ্ট হচ্ছে। বল না রাজা। বল।''
নীরব রাতের তারারা। জবাব মেলে না।