সীমান্তে উত্তেজনার আবহে জাতীয় প্রতিরক্ষা সমাবেশ সংক্রান্ত আইনে বড়সড় রদবদল এনেছে বেজিং। ২০১০ সালের পর এই প্রথম আইনটিতে এমন ব্যাপক পরিবর্তন করা হল, যার ফলে চীনের রাষ্ট্রযন্ত্র প্রয়োজনে সাধারণ নাগরিক সম্পদ, বেসরকারি প্রযুক্তি এবং পরিকাঠামোকে সরাসরি সামরিক স্বার্থে ব্যবহার করার পূর্ণ আইনি অধিকার পেয়ে গেল।
2
10
ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্থায়ী কমিটিতে গৃহীত এই পরিমার্জিত আইনটি আগামী অক্টোবর থেকে কার্যকর হতে চলেছে। আপাতদৃষ্টিতে এটি দেশের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত মনে হলেও, প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব সরাসরি পড়তে চলেছে ভারতের ওপর।
3
10
সবচেয়ে নজরকাড়া বিষয় হল, নতুন এই আইনে সামরিক সমাবেশের পরিধি কেবল সরাসরি সশস্ত্র হামলার মোকাবিলার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে ‘উন্নয়নমূলক স্বার্থ’ কথাটিও। এর অর্থ দাঁড়ায়, আঞ্চলিক বা অর্থনৈতিক নিরাপত্তা কিংবা বিদেশে থাকা চীনা সম্পদ কোনওভাবে বিপন্ন হচ্ছে মনে করলেই বেজিং দেশজুড়ে যেকোনও সম্পদকে সামরিক ছাতার তলায় নিয়ে আসতে পারবে।
4
10
টেলিকম নেটওয়ার্ক, ডেটা সেন্টার, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ড্রোন প্রযুক্তি এবং সাইবার ক্ষেত্রকে স্পষ্টতই এই আইনের আওতায় আনা হয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে যোগাযোগ ব্যবস্থা ও তথ্যের আদান-প্রদান নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও থাকবে রাষ্ট্রের হাতে।
5
10
পাশাপাশি ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী পুরুষ এবং ১৮ থেকে ৫৫ বছর বয়সী মহিলাদের জাতীয় প্রয়োজনে সামরিক সহায়তা ও শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে অংশ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি করা হয়েছে। সাধারণ শিল্পকারখানাগুলোকেও শান্তিকালীন সময় থেকেই এমনভাবে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে, যাতে সংঘাতের মুহূর্তে সেগুলো নিমেষেই প্রতিরক্ষা উৎপাদনে রূপান্তরিত হতে পারে।
6
10
লাদাখ সংঘাতের পর থেকেই প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় (LAC) দুই দেশের সেনাই দীর্ঘমেয়াদী মোতায়েনে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে চীনের এই নতুন পদক্ষেপ ভারতের জন্য যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।
7
10
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারত-চীন সংঘাত যদি কেবল স্বল্পমেয়াদী যুদ্ধের মধ্যে আটকে না থেকে দীর্ঘস্থায়ী আকার নেয়, তবে চীন তার বিপুল বেসামরিক ও প্রযুক্তিগত শক্তিকে মুহূর্তে যুদ্ধ শক্তিতে রূপান্তরিত করার যে আইনি ও পরিকাঠামোগত কাঠামো গড়ে তুলল, তা সংঘাতের ভারসাম্য বিগড়ে দিতে পারে।
8
10
তাছাড়া পাকিস্তান ও চীন—এই দ্বিমুখী সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে ভারতের ওপর সামরিক ও রসদ সরবরাহের চাপ বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। আধুনিক সংঘাত কেবল বন্দুক বা গোলার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই; সাইবার হামলা, ডেটা নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক চাপ একসঙ্গে প্রয়োগ করাই বর্তমান রণকৌশল।
9
10
এই বাস্তবতায় ভারতের কৌশলগত মহলের অভিমত, ভারতের হুবহু এই মডেল নকল করার দরকার নেই, তবে নিজেদের দুর্বলতাগুলো অবিলম্বে দূর করা অত্যন্ত জরুরি। কেবল সীমান্তের প্রাথমিক সংঘাত সামলানো নয়, যেকোনো দীর্ঘস্থায়ী সংকট মোকাবিলায় ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী ও দেশীয় শিল্পের সমন্বয় বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
10
10
একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোর সাইবার নিরাপত্তা নিশ্ছিদ্র করা, সরবরাহ শৃঙ্খল সুরক্ষিত রাখা এবং প্রযুক্তি ক্ষেত্রকে জাতীয় প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত করার দিকে নয়াদিল্লিকে এখনই কড়া নজর দিতে হবে। আগামী দিনে যুদ্ধক্ষেত্রে শুধুই অস্ত্রের শক্তি নয়, বরং সমগ্র জাতীয় শক্তিকে কে কত দ্রুত ও টেকসইভাবে একত্রিত করতে পারছে, সেটাই জয়ের মূল নির্ধারক হয়ে উঠবে।