হোটেলের রুম থেকে অবিবাহিত 'কাপলদের' কি পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারে? আইন কী বলে?
নিজস্ব সংবাদদাতা
১৪ জানুয়ারি ২০২৬ ১৬ : ১৯
শেয়ার করুন
1
10
ভারতে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা আর সামাজিক নীতিবোধের সংঘাত সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে অবিবাহিত যুগলদের হোটেলে থাকার প্রশ্নে। আইনত কোনও নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও, বাস্তবে বহু যুগলকে এখনও নীতি পুলিশ, পরিষেবা দিতে অস্বীকার এমনকি পুলিশি হয়রানির মুখে পড়তে হয়। ফলে প্রশ্নটা বারবার উঠে আসে অবিবাহিত যুগল কি সত্যিই আইনের চোখে হোটেলে থাকতে পারেন?
2
10
ভারতীয় আইনে অবিবাহিত যুগলদের একসঙ্গে হোটেলে থাকার ওপর কোনো নিষেধ নেই। সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ নাগরিকের জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার সুনিশ্চিত করে। এই অধিকারের মধ্যেই পড়ে নিজের সঙ্গী নির্বাচন, স্বাধীনভাবে চলাফেরা করা এবং যেখানে ইচ্ছা বসবাস করার স্বাধীনতা বিয়ে হয়েছে কি হয়নি, তা এখানে বিবেচ্য নয়।
3
10
এই বিষয়ে মাদ্রাজ হাইকোর্ট এক ঐতিহাসিক মন্তব্যে পরিষ্কার জানায়, “বিপরীত লিঙ্গের অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের হোটেল রুমে অতিথি হিসেবে থাকার বিরুদ্ধে কোনও আইন বা বিধি নেই।” এর অর্থ, প্রাপ্তবয়স্ক দু’জন মানুষ নিজেদের সম্মতিতে একই ঘরে থাকলেই তা অনৈতিক বা বেআইনি হয়ে যায় না। হোটেল কর্তৃপক্ষ বা পুলিশ এই কারণে কাউকে শাস্তি দিতে পারে না।
4
10
আইন অনুমতি দিলেও, হোটেলে থাকতে গেলে কয়েকটি শর্ত মানা জরুরি। প্রথমত, দু’জনকেই ১৮ বছরের বেশি হতে হবে কারণ এটাই প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আইনি বয়স। দ্বিতীয়ত, আধার, প্যান, ভোটার আইডি, ড্রাইভিং লাইসেন্স বা পাসপোর্টের মতো বৈধ সরকারি পরিচয়পত্র দেখাতে হবে। নিরাপত্তা ও নথিভুক্তিকরণের জন্য হোটেলগুলি এগুলো চায়।
5
10
অনেক হোটেল এখনও অবিবাহিত যুগলদের ঘর দিতে অস্বীকার করে। আইন নয়, বরং এটি তাদের অভ্যন্তরীণ নীতি। বিশেষ করে ছোট শহর বা মফস্সলে সামাজিক চাপ, নৈতিক পাহারার ভয় কিংবা পুলিশের সঙ্গে অযথা ঝামেলার আশঙ্কা থেকে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই ক্ষেত্রে ‘কাপল-ফ্রেন্ডলি’ বলে চিহ্নিত হোটেল আগে থেকেই অনলাইনে বুক করাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
6
10
আইনে কোথাও বলা নেই যে একই শহরের অবিবাহিত যুগল হোটেলে থাকতে পারবেন না। তবু বাস্তবে অনেক সময় এই অজুহাত দেখিয়ে ঘর দেওয়া হয় না। এমন হলে ক্রেতা অধিকার প্ল্যাটফর্মে অভিযোগ জানানো বা সংশ্লিষ্ট বুকিং অ্যাপে রিপোর্ট করার সুযোগ রয়েছে।
7
10
অবিবাহিত যুগলদের একসঙ্গে ভাড়া বাড়িতে থাকাও বেআইনি নয়। তবে সমাজের রক্ষণশীল মানসিকতার কারণে অনেক বাড়িওয়ালা অনীহা দেখান। আইনি সুরক্ষার জন্য দু’জনের নাম দিয়ে রেজিস্ট্রি ভাড়ার চুক্তি করা, থাকার উদ্দেশ্য ও মেয়াদ স্পষ্ট করা এবং প্রয়োজনে পুলিশ ভেরিফিকেশন করিয়ে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ।
8
10
যদি যুগল দু’জনই প্রাপ্তবয়স্ক হন, সম্মতিতে থাকেন, বৈধ পরিচয়পত্র থাকে এবং কোনও বেআইনি কাজে যুক্ত না থাকেন, তবে পুলিশ গ্রেপ্তার বা আটক করতে পারে না। অনেক সময় পুলিশ আইপিসি ২৯৪ ধারা পাবলিক প্লেসে অশ্লীল আচরণ দেখিয়ে ভয় দেখায়। কিন্তু আদালত একাধিকবার জানিয়েছে, ব্যক্তিগত হোটেল রুম কোনোভাবেই ‘পাবলিক প্লেস’ নয়। শুধু একসঙ্গে থাকা বা স্নেহ প্রকাশ করাকে আইন অশ্লীলতা বলে মানে না।
9
10
লিভ ইন সম্পর্কে জন্ম নেওয়া সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়েও বহু দুশ্চিন্তা থাকে। সুপ্রিম কোর্ট এস.পি.এস. বালাসুব্রামনিয়ম বনাম সুরুত্তায়ান মামলায় জানায়, দীর্ঘদিন একসঙ্গে থাকা যুগলের ক্ষেত্রে বিবাহের একটি আইনি অনুমান করা যায় এবং সেই সম্পর্ক থেকে জন্ম নেওয়া সন্তান অবৈধ নয়। ফলে ওই সন্তানের উত্তরাধিকার, শিক্ষা ও ভরণপোষণের অধিকার সুরক্ষিত।
10
10
শহুরে ভারতে সচেতনতা বাড়ছে, অনলাইন বুকিং প্ল্যাটফর্ম অবিবাহিত যুগলদের জন্য নিরাপদ জায়গা তৈরি করছে। তবু গ্রাম বা ছোট শহরে সামাজিক 'stigma' এখনও প্রবল। এই ব্যবধান কমাতে আইনি সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি। অবিবাহিত যুগল হিসেবে হোটেলে থাকা কোনও অপরাধ নয়। সংবিধান, সুপ্রিম কোর্ট সবাই ব্যক্তিগত স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়িয়েছে। ভয় নয়, জেনে নিন নিজের অধিকার, আত্মবিশ্বাসী থাকুন এবং প্রয়োজন হলে আইনি সহায়তা নিন। আইন আপনার পাশেই আছে।