বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র আবারও সামনে এল জাতীয় সমীক্ষায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর পরিচালিত এবং রাষ্ট্রসংঘের জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ)-এর সহায়তায় করা এক সমীক্ষা জানাচ্ছে, দেশের ৭৫ শতাংশেরও বেশি বিবাহিত নারী তাঁদের জীবনে অন্তত একবার স্বামীর বা সঙ্গীর হাতে হিংসার শিকার হয়েছেন।
2
8
সোমবার প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই হিংসার মধ্যে রয়েছে শারীরিক নির্যাতন, যৌন হিংসা, অর্থনৈতিক নিপীড়ন এবং নারীর উপর নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ। সমীক্ষায় অংশ নেওয়া বহু মহিলা জানিয়েছেন, এই নির্যাতন শুধু ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক অবস্থান ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার উপর।
3
8
সমীক্ষা অনুযায়ী, ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সি নারীদের মধ্যে নির্যাতনের হার সবচেয়ে বেশি। এই বয়সের বিবাহিত নারীদের ক্ষেত্রে হার ৮০ শতাংশেরও বেশি। একইভাবে শহরের বস্তি অঞ্চল এবং দুর্যোগপ্রবণ উপকূলীয় এলাকা, বিশেষ করে বরিশাল ও খুলনা অঞ্চলে, মহিলারা তুলনামূলকভাবে বেশি হিংসার মুখোমুখি হচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, দারিদ্র্য, সামাজিক অনিশ্চয়তা, অল্প বয়সে বিয়ে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ধাক্কা এই অঞ্চলের নারীদের আরও বেশি ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
4
8
এই সমীক্ষায় সারা দেশ থেকে ২৭ হাজারেরও বেশি মহিলার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। এটি ২০১১ সালের পর থেকে পরিচালিত তৃতীয় ‘ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন’ সমীক্ষা। যদিও প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে যে নির্যাতনের হার সামান্য কমেছে, ২০১৫ সালে যেখানে ৮৩ শতাংশ নারী হিংসার কথা জানিয়েছিলেন, সেখানে এবার সেই হার কিছুটা কম, তবু বিশেষজ্ঞরা একে ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ বলেই মনে করছেন।
5
8
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রধান মহম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, “এই সমীক্ষা হিংসার ব্যাপকতা, কারণ ও প্রভাব সম্পর্কে শক্ত প্রমাণ হাজির করেছে। নীতি নির্ধারণ ও কার্যকর পদক্ষেপের জন্য এই তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
6
8
ইউএনএফপিএ-র প্রতিনিধি ক্যাথরিন ব্রিন কামকং এই রিপোর্ট প্রকাশের পর বলেন, “এই প্রতিবেদনকে কেবল পরিসংখ্যান হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি নারী নির্যাতন প্রতিরোধে রূপান্তরমূলক পদক্ষেপ, পরিষেবা জোরদার এবং নির্যাতনের শিকার নারীদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার সূচনা হওয়া উচিত।”
7
8
এই সমীক্ষা এমন এক সময়ে প্রকাশিত হল, যখন বাংলাদেশ তীব্র রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার কট্টর সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে অস্থিরতা তৈরি হয়। এর পর থেকেই নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ১৭ কোটি জনসংখ্যার মুসলিম-প্রধান এই দেশে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা, যা গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রথম নির্বাচন।
8
8
এই প্রেক্ষাপটে মানবাধিকার কর্মী ও সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, শুধু আইন নয়—নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রয়োজন সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন, কার্যকর আইন প্রয়োগ, এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। নইলে পরিসংখ্যান বদলালেও বাস্তবতায় বাংলাদেশের নারীদের জীবনে নিরাপত্তা ও মর্যাদা অধরাই থেকে যাবে।