ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে অমিতাভ বচ্চন শুধু একজন তারকা নন, তিনি এক জীবন্ত প্রতিষ্ঠান। পাঁচ দশকেরও বেশি দীর্ঘ কেরিয়ারে অসংখ্য কালজয়ী চরিত্র, বক্স অফিস সাফল্য এবং অভিনয়ের অনন্য মাইলফলক ছুঁয়েছেন তিনি। তবে পর্দার বাইরেও অমিতাভ বচ্চনের আরেকটি পরিচয় রয়েছে। অদম্য শৃঙ্খলা, সময়ানুবর্তিতা এবং পেশাদারিত্বের এক নিখুঁত মানদণ্ড তিনি।

ইন্ডাস্ট্রিতে অমিতাভের বহু সহ-অভিনেতা ও পরিচালক বহুবার বলেছেন, অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে কাজ মানেই শুটিং ফ্লোরে এক অন্যরকম নিয়মানুবর্তিতার পরিবেশ তৈরি হয়ে যায়। সময়ের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা এতটাই গভীর যে পরিস্থিতি যেমনই হোক, পূর্বনির্ধারিত শিডিউল ভাঙা তাঁর অভিধানে নেই বললেই চলে। এবার সেই শৃঙ্খলারই এক অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন অভিনেতা রাজা বুন্ডেলা।

১৯৮৯ সালের থ্রিলার ছবি ‘ম্যাঁয় আজাদ হুঁ’-তে অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে কাজ করেছিলেন রাজা বুন্ডেলা। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে সেই ছবির শুটিংয়ের এক ঘটনা তুলে ধরেন তিনি। রাজা জানান, ছবির একটি শুট চলছিল গোয়ায়। সেখানেই হঠাৎ জানা যায়, অমিতাভ বচ্চনের চরিত্রের কন্টিনিউটির জন্য প্রয়োজনীয় জুতোর জোড়া ভুল করে মুম্বইতেই রয়ে গেছে।

সেই সময় পরিস্থিতি মোটেই সহজ ছিল না। আজকের মতো ঘনঘন ফ্লাইট চলত না, যোগাযোগ ব্যবস্থাও ছিল সীমিত। অথচ যে দৃশ্যটির শুট হওয়ার কথা ছিল, সেখানে অমিতাভের চরিত্র রাস্তা দিয়ে হাঁটছে, হঠাৎ একটি আপেল দেখতে পায়। চরিত্রটি দু’দিন ধরে না খেয়ে রয়েছে। সে আপেলটি কুড়িয়ে নেয়, চারপাশে তাকায়, তারপর খায়। এই দৃশ্যে তিনি যখন ঝুঁকবেন, তখন জুতো স্পষ্টভাবে ক্যামেরায় ধরা পড়বে। অর্থাৎ কন্টিনিউটি বজায় রাখা ছিল বাধ্যতামূলক।

 

রাজা বুন্ডেলা জানান, সেই সময় অমিতাভ বচ্চনের একটি অভ্যাস ছিল, যে ছবিতেই কাজ করুন না কেন, শুট শেষ হলে তিনি নিজেই কন্টিনিউটির সমস্ত জিনিস সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন। প্রোডাকশনের হাতে ফেলে রাখতেন না। পরবর্তী শিডিউল পর্যন্ত সেই দায়িত্ব নিজেই সামলাতেন।

কিন্তু সেই দিন একটি ছোট ভুল হয়ে যায়। শুটের জন্য গোয়া যাওয়ার সময় তাঁর স্পটবয় জুতোর দিকে নজর দেননি, আর সেগুলো মুম্বইতেই থেকে যায়। এই খবর ছড়াতেই ইউনিটে এক অদ্ভুত স্বস্তির পরিবেশ তৈরি হয়। অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, পরের দিনের শুট আর হবে না। কেউ কেউ তো আগেভাগেই ‘ছুটি’ ধরে নিয়ে উদ্‌যাপন শুরু করে দেন।

কিন্তু পরের দিন সকাল সাড়ে সাতটায় পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। রাজা জানান, খবর আসে, অমিতাভ বচ্চন সম্পূর্ণ মেকআপ নিয়ে, কস্টিউম পরে, জুতোসহ শুটের জন্য প্রস্তুত। অথচ পরিচালক, প্রযোজক, ইউনিটের কেউই তখনও তাঁর কাছে যাওয়ার সাহস পাচ্ছিলেন না। অমিতাভ চুপচাপ বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন -একদম টেনশন ফ্রি মেজাজে, শুটিংয়ের আগে নিজেকে নিয়ে যাবতীয় সব প্রতূতি সেরে।

পরে জানা যায়, আগের রাতে অমিতাভ বচ্চন নিজের উদ্যোগে স্পটবয়কে বাসে করে মুম্বই পাঠান। সেখান থেকে জুতো সংগ্রহ করে স্পটবয় প্রথম ফ্লাইট ধরেই ভোরে গোয়ায় ফিরে আসেন। সব কিছু ঠিকঠাক নিশ্চিত করেই অমিতাভ পরিচালক টিনু আনন্দকে ফোন করে জানান, শুট শুরু করা যেতে পারে। রাজা বুন্ডেলার কথায়, “এই ছিল অমিতাভ বচ্চনের ডিসিপ্লিন। কোনও অজুহাত নেই, কোনও বিশৃঙ্খলা নেই। শুধু কাজের প্রতি সম্পূর্ণ দায়বদ্ধতা।”

এই একটিমাত্র ঘটনাই যেন ব্যাখ্যা করে দেয়, কেন অমিতাভ বচ্চন শুধু একজন সুপারস্টার নন, বরং ভারতীয় সিনেমায় পেশাদারিত্বের এক অনুকরণীয় উদাহরণ। শুটিং ফ্লোরে তাঁর উপস্থিতি মানেই সময়ের শাসন, দায়িত্বের গুরুত্ব আর কাজের প্রতি নিঃশর্ত সম্মান, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাঁকে আলাদা করে রেখেছে।