৮ জানুয়ারি, বৃহস্পতিবার যশের জন্মদিনেই মুক্তি পেয়েছে ‘টক্সিক’ ছবির প্রথম ঝলক। অভিনেতার জন্মদিনে নির্মাতারা তুলে ধরলেন টক্সিক: আ ফেয়ারিটেল ফর গ্রোন আপস-এর ঝলক, যা শুধু যশের বড়পর্দায় প্রত্যাবর্তনই ঘোষণা করল না, বরং দর্শককে টেনে নিল এক অন্ধকার, রহস্যময় জগতে যা একইসঙ্গে স্টাইলিশও বটে। ২০২২-এর ‘কেজিএফ: চ্যাপ্টার ২’-এর পর এই ছবির হাত ধরেই ফের বড়পর্দায় ফিরছেন যশ।
টিজারে ধোঁয়া, ধীরগতির আত্মবিশ্বাসী হাঁটা, নিয়ন্ত্রিত বিশৃঙ্খলার আবহে যশের চরিত্র ‘রায়া’র পরিচয় হয় দর্শকের সঙ্গে। এটি কোনও চেনা ছকে বাঁধা মাস-মুভির ঘোষণা নয়, বরং যেন প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তৈরি এক আধুনিক ডার্ক ফেয়ারিটেলে প্রবেশের দরজা।পরিচালক গীতু মোহানদাস আগেই ছবিটিকে ‘ফেয়ারিটেল ফর গ্রোন-আপস’ বলে ব্যাখ্যা করেছেন। সেই কারণে এই ছবিতে কোনও কিছুই হঠাৎ নয়, এমনকী চরিত্রের নামও নয়। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, 'টক্সিক'-এর মতো ডার্ক ছবিতে যশ-কে যেমন আলো-আঁধারি চরিত্রে দেখা যাচ্ছে সেখানে কেন এই চরিত্রটির নাম রায়া? জানিয়ে রাখা ভাল, ‘রায়া’ শুধুই কেতাদুরস্ত কোনও নাম নয়, বরং যার অর্থ বহুস্তরীয়, প্রতীকী এবং গভীর অর্থবহ।
সংস্কৃতে ‘রায়া’ শব্দের অর্থ রাজা বা শাসক। অর্থাৎ প্রথম থেকেই যশের চরিত্রকে ক্ষমতা, কর্তৃত্ব এবং নেতৃত্বের আসনে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। বড়পর্দায় যশের উপস্থিতি এমনিতেই এই আধিপত্য সহজাতভাবে বহন করে। ভারতীয় দর্শকের কাছে এই নাম অনিবার্যভাবেই মনে করিয়ে দেয় বিজয়নগর সাম্রাজ্যের কিংবদন্তি শাসক কৃষ্ণদেব রায়ার কথা, যিনি একদিকে ছিলেন দুর্ধর্ষ যোদ্ধা, অন্যদিকে সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক।
টিজারে যদিও রায়াকে কোনও আদর্শ শাসক হিসেবে তুলে ধরা হয়নি, তবু তাঁকে এমন এক চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যার চারপাশে পৃথিবী নিজেই বেঁকে যায়। অথবা প্রয়োজনে তিনিই পৃথিবীকে নিজের মতো করে বাঁকান। প্রাপ্তবয়স্কদের ফেয়ারিটেলে রাজারা খুব কমই ব্যাকরণ মেনে ভাল নায়ক হন। বরং সেই রাজারা হন, ত্রুটিপূর্ণ, বিপজ্জনক এবং প্রায়শই নিঃসঙ্গ। ‘রায়া’ নাম দিয়ে ‘টক্সিক’ যশের চরিত্রকে এক আলো-আঁধারির এক ধূসর ব্যক্তিত্বের আধুনিক সম্রাট হিসেবে তুলে ধরছে, যিনি শাসন করেন, কিন্তু সেই শাসনের মূল্য চুকোতে হয়।
তবে ‘রায়া’-র অর্থ এখানেই শেষ নয়। সংস্কৃতে এই শব্দের সঙ্গে গতি, প্রবাহ, স্রোতের ধারণাও জড়িত। আর সেই ভাবনাও টিজারের ছন্দের সঙ্গে আশ্চর্যভাবে মিলে যায়। যশের চলাফেরা, দৃশ্যের মধ্যে লুকিয়ে থাকা অস্থির শক্তি, সব মিলিয়ে ‘টক্সিক’-এর প্রতিটি মুহূর্ত যেন গতিশীল। রায়া কোনও স্থির চরিত্র নয়, সে এক চলমান শক্তি।
স্রোত যেমন জীবন দেয়, তেমনই ধ্বংসও ডেকে আনতে পারে। গতি যেমন রোমাঞ্চ জাগায়, তেমনই সর্বনাশ ডেকে আনে। এই দ্বৈততা ছবির শিরোনাম এবং টিজার, দু’টির মধ্যেই ধরা পড়ে। একদিকে আকর্ষণ, অন্যদিকে বিপদ, রায়া এই দুইয়ের মধ্যেই অবস্থান করে। সে শুধু ক্ষমতাবান নয়, সে অপ্রতিরোধ্য। দ্রুতগতির স্রোতের মতো।
‘রায়া’-র সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত অর্থটি আসে হিব্রু ভাষা থেকে। সেখানে ‘রায়া’ মানে বন্ধু, সঙ্গী, প্রিয় মানুষ। এই ব্যাখ্যা চরিত্রটির ভীতিকর বাইরের আবরণের নীচে এক মানবিক সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। টিজারে আপাতদৃষ্টিতে যশের চরিত্রের সরাসরি কোনও দুর্বলতা ধরা না পড়লেও, প্রাপ্তবয়স্কদের ফেয়ারিটেল মানেই শুধু ক্ষমতার গল্প নয়, সেখানে থাকে নিঃসঙ্গতা, আকাঙ্ক্ষা আর সংযোগের খোঁজ।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে, রায়া কি ভালবাসা পায়, না কি শুধুই ভয়? সে কি সঙ্গী হতে পারে, না কি ক্ষমতা তাকে একা করে দিয়েছে? নিখুঁত স্যুট, পুরুষালি দাপট, নিয়ন্ত্রিত হিংসার আড়ালে কি লুকিয়ে আছে এক নিঃসঙ্গ মানুষের গল্প?
গিতু মোহানদাসের ‘টক্সিক’ কোনও নিষ্পাপ রূপকথা নয়। বরং এটি সেই অন্ধকার লোককথার ধারায় দাঁড়িয়ে, যেখানে রাজপুত্র দানবে পরিণত হয়, রাজ্য ভিতর থেকে পচে যায়, আর ভালবাসা হয়ে ওঠে হিংসার মতোই বিপজ্জনক। ‘রায়া’ যেন সেই উত্তরাধিকারেরই সন্তান। রূপকথায় নামই অনেক সময় ভাগ্য নির্ধারণ করে। রায়া নামের মধ্যেই রয়েছে ক্ষমতা, গতি, উদযাপন ও স্নেহ, যা সময়ের সঙ্গে নিজেদের উল্টো রূপ নিতে পারে। রাজা হয়ে উঠতে পারে অত্যাচারী, স্রোত হয়ে যেতে পারে বন্যা, ভালবাসা বদলে যেতে পারে আসক্তিতে। এই রূপান্তরগুলিকেই ঝেড়েপুঁছে দেখবে ‘টক্সিক’, ছবির টিজার আপাতত সেই ইঙ্গিত-ই দেয়।
অন্যদিকে, ‘কেজিএফ’-এর পর যশ এমন এক তারকায় পরিণত হয়েছেন, যিনি পর্দায় নিজের জগৎ নিজেই দখল করে নেন। ‘রায়া’ নামটি একদিকে তাঁর স্টার ইমেজকে ব্যবহার করে, অন্যদিকে তাকে প্রশ্নও করে। রায়া কিন্তু রকি ভাই নয়। কিন্তু ভাষা আর ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে এক সার্বজনীন প্রতীকে পরিণত হয়। যে রাজা খুব দ্রুত চলে, খুব বেশি উদযাপন করে, আর খুব বিপজ্জনকভাবে ভালবাসে।
