এপ্রিল মাস, কলকাতায় ভোট। স্বাভাবিকভাবেই রোদের তাপ আর ভোটের উত্তাপ দুই বাড়ছে চড়চড়িয়ে৷ ২০২৬ পশ্চিমবঙ্গ বিধানুসভা নির্বাচনে সোনারপুর দক্ষিণ কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী রূপা গাঙ্গুলি। সোনারপুরের মানুষ, মানুষের অসুবিধা, আগামী পরিকল্পনা সব নিয়েই ভোটের আবহে কথা বললেন আজকাল ডট ইন-এর সঙ্গে। শুনলেন সায়নী মুখার্জি। 


আপনি বহু বছর ধরেই ভারতীয় জনতা পার্টির সঙ্গে যুক্ত, ২০২৬ এর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন কেন? 

রূপা: ভারতীয় জনতা পার্টি যে সিদ্ধান্ত নেয়, আমরা কর্মীরা সেই নির্দেশ পালন করি৷ দল জানিয়েছিল এই বছর নির্বাচনে আমাকে লড়তে হবে, আমি বলেছিলাম ঠিক আছে। সিটটা কেবল আমি পছন্দ করেছি৷ যেহেতু আমি এখানে বহুদিন থেকেছি, আমার পরিচিত এলাকা, আমি দীর্ঘদিন কাজ করেছি তাই আমি সোনারপুর দক্ষিণ কেন্দ্র থেকে প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি৷ দল আমাকে বলেছিল, লড়তে তো তোমাকে হবেই। তোমার পছন্দের কেন্দ্র কোনগুলি? আমি দু-তিনটে নাম বলেছিলাম,যার মধ্যে সোনারপুর দক্ষিণও ছিল।

অভিনয় থেকে রাজনীতি, এই পরিবর্তনটা কতটা চ্যালেঞ্জিং ছিল? 

রূপা:  অভিনয় করেছি ৩৫ বছর৷ সেটা আমার পেশা ছিল। ১০ বছর আগেই ভারতীয় জনতা পার্টির সঙ্গে যুক্ত হয়েছি৷ মেম্বার অফ পার্লামেন্ট ছিলাম। মহিলা মোর্চায় কাজ করলাম৷ রাজ্য জুড়ে আন্দোলন করলাম। রাজনীতিটা করেছি বহুদিন, এখন আর তাই নতুন করে কোনও চ্যালেঞ্জ মনে হয় না।

আপনার কেন্দ্রে বর্তমানে সবথেকে বড় সমস্যা কী? 

রূপা: বেশিরভাগ জায়গায় রাস্তা৷ কয়েকটা প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনায় করা রাস্তা আছে৷ কিন্তু ভিতরের রাস্তা ভয়ানক খারাপ৷ পঞ্চায়েত এলাকা হোক বা পৌরসভা এলাকা, সেখানে কাউন্সিলর কিছুই করেননি৷ এমএলএ-ও কিছুই করাতে পারেননি৷ পাখির সাইজের মশা৷ রাজপুরে আমার বাড়ি যাওয়া মানেই বিকেল থেকে মশার উপদ্রব৷ মায়ের কাছেও শুনেছি, নিজেও ভুক্তভোগী।  

রাস্তা যখন এত খারাপ তাহলে জল জমে যাওয়ার সমস্যাও আছে?  

রূপা: গরমকালে জল পাবেন না। প্রচুর জায়গা আছে, পরিশুদ্ধ পানীয় জল নেই৷ মানুষজল জল কিনে খান৷ গ্রামীণ এলাকায় এখনও কয়েকটা পুকুর বেঁচে আছে৷ কিন্তু যে সব এলাকায় পুকুর ভরাট করে বিল্ডিং বানানো হয়েছে, সেখানে একটু বৃষ্টি হলেই হাঁটু পর্যন্ত জল জমে যায়৷ ড্রেন এত অপরিস্কার, তিন বছর ধরে কোনও উন্নতি দেখিনি। ৩০ বছর আগে যা অবস্থা ছিল রাস্তার এখনও তাই৷ একটা রাস্তা বানালে ছ'মাসও যায় না রাস্তার হাল বেহাল হয়ে যায়৷ 

সোনারপুর দক্ষিণ কেন্দ্রে জেতার বিষয় আপনি কতটা আশাবাদী? 

রূপা: জেতা তো মানুষের উপর নির্ভর করে৷ মানুষ পরিবর্তন চান, মানুষ বিজেপিকে চান। আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে যাতে মানুষ নিজের ভোট দিতে যেতে পারে সেটা খেয়াল রাখা। নির্বাচনের কমিশনের দায়িত্ব স্বচ্ছ ভাবে ভোট যাতে হয় সেটা খেয়াল রাখা। সোনারপুর দক্ষিণের মানুষের যে অভিব্যক্তি, তা দেখে মনে হয়েছে মানুষ আমাকে আশীর্বাদ করেছেন, করতে চলেছেন৷ 

সোনারপুর দক্ষিণ কেন্দ্রে আপনি একাধিক সমস্যার কথা বললেন৷ জিতলে প্রথম আপনি কোন সমস্যার সমাধান করবেন? 

রূপা: প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনার মাধ্যমে এখানে পঞ্চায়েত এলাকায় রাস্তাগুলো ঠিক করা যায়৷ রাস্তা নির্মাণের জন্য টাকা এসেছে৷ কিন্তু ৩৩ কোটি উধাও, এভাবে তো চলতে পারে না৷ এরপর পুকুর ড্রেন পরিস্কার করাতে হবে৷ যে রাজনৈতিক দলের কাউন্সিলরই থাকুন না কেন, তাকে দিয়ে এই কাজগুলো করানো আমার লক্ষ্য৷ কেন্দ্রীয় সরকারের বহু প্রকল্প আছে, সেই সব প্রকল্পের টাকাও আসে। সেই প্রকল্পের মাধ্যমে চাইলেই এসব এলাকার উন্নতি করা যায়৷ সোনারপুর দক্ষিণ কেন্দ্রের উন্নতি করাই আমার লক্ষ্য৷ 

কর্মসংস্থান নিয়ে আপনার কী পরিকল্পনা?

রূপা: কর্মসংস্থান তো ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু সেভাবে করা যায় না। বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসতে চলেছে, এই বিষয় কোনও সন্দেহ নেই। সপ্তম পে কমিশন মেনে বকেয়া ডিএ ঠিকমতো দেওয়া৷ এত মানুষের এত টাকা বাকি, রাজ্য সরকার দেয়নি। পশ্চিমবঙ্গে মধ্যবিত্ত বাঙালির সংখ্যাই বেশি৷ শিক্ষিত হয়ে এই রাজ্যের প্রচুর ছেলেমেয়ে চাকরি না পেয়ে বাইরে চলে যাচ্ছেন৷ শিক্ষিত বেকারের সংখ্যাও নেহাত কম নয়৷ তাদের জন্য আমাদের সরকারের তরফে পূর্বপরিকল্পনা করা আছে৷ প্রচুর কোম্পানি আসবে, কর্মসংস্থান হবে৷ পশ্চিমবঙ্গের মানুষ যখন বাইরে গিয়ে চাকরি করছেন, তখন খরচ বেড়েও যায়৷ আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় যে, টাকা বেশি পাচ্ছেন কিন্তু বাড়ি ভাড়া, নিজের খরচ, এখানে বাবা মায়ের খরচ সব মিলে কিন্তু অনেকটাই চাপ বেড়ে যায়৷ শিক্ষিত ছেলেমেয়ে যারা চাকরি করতে চায়, কোম্পানিগুলো এলে তারা চাকরি পাবে। আমি শুধু আপনার মাধ্যমে এটুকুই বলব, ইয়ং জেনারেশন যারা পড়াশোনা করছ, সদ্য কলেজ পাশ করেছ, তারা নিজেদের তৈরি করো, আপগ্রেড ইউওরসেলফ অ্যাস মাচ অ্যাস ইউ ক্যান৷ কোম্পানিগুলো এলে অনেক সুযোগ পাবে৷ 

বর্তমান রাজ্য সরকারকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? 

রূপা: দেখুন এই সরকারকে মানুষ ১৫ বছর দিয়েছে৷ মানুষ তো তৃণমূলনেত্রীকে অনেক বিশ্বাস করেছিলেন৷ বিশ্বাসের উনি পূর্ণ মর্যাদা রাখতে পারলেন না৷ কলকাতার বাইরে গেলেই জল পাব না, মশার কামড়ে ডেঙ্গি ম্যালেরিয়া হয়ে মানুষ মরবে, কলকাতা থেকে ২০-২৫ মিনিট দূরত্বে কোনও জায়গায় যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে কী বলব! রাজ্য সরকার অর্ধেকটা চলছেই তো কেন্দ্র সরকারের টাকায়৷  

 মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একাধিকবার অভিযোগ করেছেন, কেন্দ্র সরকারের তরফ থেকে রাজ্যের উন্নতিকল্পে বহু টাকা বাকি আছে, কী বলবেন? 

রূপা: ধরা যাক আপনার বাবা আপনাকে বললেন, আড়াইশো টাকা রাখো, বাজার করে এনো৷ এভাবে যদি চলে ছ'মাস পরে বাবা তো বলবেন যে বাজারের জন্য যে টাকা দিচ্ছি হিসাব তো তুমি দিলে না। হিসাব না দিলে একদিন তো আপনার বাবা মাও বলবেন৷ এটাই তো নিয়ম। বারবার অভিযোগ যাচ্ছে, যাঁদের বাড়ি আছে, তাদের আবাস যোজনা দেওয়া হচ্ছে৷ যাঁরা কোনও কাজই করে না, তাঁদের ফেক জব কার্ড আছে৷ সই করে টাকা নিয়ে চলে যাচ্ছে৷ পুকুর ভরাটের নাম করে টাকা নয়ছয় হচ্ছে৷  আগে যেমন সরকারের কাছে সরাসরি টাকা আসত৷ এখন সেটা হয় না। আধার কার্ড প্যান কার্ড লিঙ্ক, ফলে কে পাওয়ার যোগ্য আর কে নয় সেটা ধরা পড়ে যাচ্ছে৷ 

প্রতিপক্ষদের নিয়ে কী বলবেন? 

রূপা: সকলেই যে যাঁর মতো কাজ করবেন।  প্রতিপক্ষ যাঁরা, তাঁরা সকলেই সম্মাননীয় ব্যক্তি। আমার তাঁদের নিয়ে কিছু বলার নেই। 

আপনার 'দৌপদী ইমেজ' কি রাজনীতিতে কোনওভাবে সহায়তা করেছিল? 

রূপা: দৌপদী ইমেজটা এখনও অবাঙালিদের মধ্যে আছে৷ কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মানুষ তো আমার বহু বাংলা সিনেমাও দেখেছেন৷ কিছু কিছু মানুষের মধ্যে আছে৷ বাড়িতে টিভিতে একসঙ্গে মহাভারত দেখতাম৷ কিন্তু পশ্চিমবঙ্গবাসী আমাকে এমনিই রূপা গাঙ্গুলি হিসাবেই চেনেন৷ অভিনেত্রী হিসাবেও আবার রাজনীতির জন্যও। 

তারকাপ্রার্থী হওয়ার সুবিধা আছে নাকি আলাদা করে চাপ তৈরি করে? 

রূপা: আমি নিজেকে তারকা মনে করি না। ১০ বছর ধরে রাজনীতি করলে সে আর তারকাপ্রার্থী থাকে না৷ সে রাজনীতির কর্মী হয়ে ওঠে৷ মাঠে ময়দানে যেভাবে আন্দোলন করেছি, যে ১০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে ৩৫ জনের মতো অপরাধীদের অ্যারেস্ট করায় সে আর তারকাপ্রার্থী থাকে না। রাজনীতির মানুষই হয়ে ওঠেন৷ 

রাজ্যসভায় বগটুই কান্ড সম্পর্কে বক্তব্য করাকালীন আপনি কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন, রাজনীতিতে এতটা ইমোশনাল হলে কি চলে?  

রূপা: জানি না, এগুলো প্রচলিত কথা বলা যায়৷ কিন্তু রাজনীতিতে ইমোশনাল হলে চলে কি চলে না এই বিষয় আমার ধারণা নেই। 

 প্রচারে সারাদিন কী খাচ্ছেন? 

রূপা: খুব সাধারণ ভাবে জীবন কাটে৷ লাল চা, ব্ল্যাক কফি। ব্রেকফাস্টে কড়কড়ে একটা টোস্ট। 
দুপুরে আলুসিদ্ধ, ডাল, ভাত, উচ্ছে সিদ্ধ, পেঁপে সিদ্ধ, ডিম সিদ্ধ৷ যা খেয়ে শরীর খারাপ করবে না সেরকম খাবার খাই৷ আমি চিংড়ি মাছের মালাইকারি খেতে খুব ভালবাসি কিন্তু এই গরমে এখন তো এসব খাওয়া যাবে না৷ রাত্রে সাধারণত রুটি তরকারি৷ রুটি, আলু পেঁয়াজ ভাজা, সঙ্গে একটা কাঁচা পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা, আহা!