রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের আকস্মিক মৃত্যুকে ঘিরে স্তম্ভিত টলিউড। তালসারিতে ধারাবাহিকের শুটিং করতে গিয়ে কীভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন ৪২-এর অভিনেতা, তা যেন কিছুতেই মেনে পারছে না দর্শকমহল। সোমবার দুপুরে রাহুলের মরদেহ বাড়িতে নিয়ে আসার পর কেওড়াতলা মহাশ্মশানে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। কিন্তু এই মর্মান্তিক ঘটনার পর এতটুকু বদল আসেনি টলিপাড়ায় শুটিং শিডিউলে। আর পাঁচদিনের মতোই চেনা ব্যস্ততা ধরা পড়ে স্টিডওপাড়ায়। আর এনিয়েই ক্ষোভপ্রকাশ করেছেন সুদীপ্তা চক্রবর্তী। ফেসবুকে টলিউডের 'অমানবিকতা' নিয়ে পোস্ট করেছেন অভিনেত্রী।
শুটিংয়ের কারণে রাহুলের শেষযাত্রায় সামিল হতে পারেননি টলিপাড়ার বহু তারকা। আর এবিষয়ে সুদীপ্তা সরাসরি শিল্পীদের ‘একটাই পরিবার’ তকমাটির দিকে আঙুল তুলেছেন। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, "নজরুল মঞ্চে বা ধনধান্য অডিটোরিয়ামে ভিড় বাড়াতে হবে বলে যখন তখন শুটিং বন্ধের নির্দেশ দেওয়া যায়, কিন্তু একজন তরুণ অভিনেতার শুটিং চলাকালীনই অকস্মাৎ মৃত্যুতে শোক জ্ঞাপন করে আধ বেলা শুটিং বন্ধ রাখার কোনো নির্দেশ কোথাও থেকে আসেনা।"
শুধু তাই নয়, সুদীপ্তার আরও সংযোজন, "শিল্পীদের বিভিন্ন ভূষণে ভূষিত হবার বার্ষিক দৃশ্য সচক্ষে দেখতে পাওয়ার স্বর্গীয় আনন্দ থেকে কোনো শিল্পী বা কলাকুশলী যাতে এ জীবনে বঞ্চিত না হন তা নিশ্চিত করতে সিনেমা, ওয়েব সিরিজ এমনকি দৈনিক ধারাবাহিকের শুটিং ও বন্ধ রাখা যায়, তখন এপিসোড ব্যাঙ্কিং এ টান পড়ে না, টেলিকাস্ট আটকে যাবার ভয় থাকে না, কিন্তু নিজের ভ্রাতৃসম সহশিল্পীকে শেষ দেখা দেখতে যেতে দেবার জন্য আধ ঘণ্টা শুটিং বন্ধ করার নির্দেশ দিতে গেলেই ব্যাঙ্কিং কমে যাবার ভয় জাঁকিয়ে বসে, টেলিকাস্ট আটকে যাবার ভয় থাকে, প্রযোজকদের অনেক বড় ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়। এই তবে 'আমাদের একটাই পরিবার' যেখানে প্রায়ই 'ভুল বোঝাবুঝি' হয় আবার চা সিঙাড়া খেয়ে তা মিটেও যায়?এই তবে 'আমাদের টলিউড'?"
জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেত্রী আক্ষেপের সুরে বলেন, "তুমি রিক্সা বা অটো চালাও না, নিদেনপক্ষে সবজি ও বেচো না যে তোমার ইউনিয়ন তোমার মৃত্যুতে দোকান বন্ধ রাখবে। তুমি 'দু পয়সার শিল্পী' মাত্র। কথা বোলোনা বেশি। যাও গিয়ে নাচো, গান গাও, অভিনয় কর। তুমি মনের আনন্দ টা ঠিক করে দেখাও।"
একইসঙ্গে শিল্পীারা যেভাবে প্রতিমুহূর্তে অনিশ্চয়তায় মধ্যে কাজ করেন সেই বিষয়টিও তুলে ধরেছেন সুদীপ্তা। তাঁর কথায়, "হাজার কষ্ট বুকে চেপে রেখে লিপস্টিক পমেটম মেখে তুমি প্রেমের অভিনয় টা ভালো করে কর গিয়ে, নাহলেই তোমার 'কাজ কমে যাবে', তুমি 'replaced' হয়ে যাবে। তুমি ভয় পাও। মনে রেখো তোমার পিছনেই লাইনে দাঁড়িয়ে আছে আরো অনেক অনেক শিল্পী, তোমাকে 'replace' করার জন্য। তারা সবাই ভালো মুখস্থ করতে পারে, তাই তারা ও সবাই 'শিল্পী'।
রাহুলের মৃত্যু নিয়ে প্রথম থেকেই একের পর প্রশ্ন উঠেছে। রয়েছে একাধিক ধোঁয়াশা। 'ভোলে বাবা পার করেগা' ধারাবাহিকের যেখানে শুটিং চলছিল, সেখানে কি কোনও প্রশিক্ষিত মেডিক্যাল কর্মী উপস্থিত ছিলেন? দুর্ঘটনার মতো পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল কিনা, তা নিয়েও স্পষ্ট উত্তর মেলেনি এখনও। এপ্রসঙ্গে আজকাল ডট ইন-কে এই সিরিয়ালের প্রোডাকশন হাউসের অন্যতম কর্ণধার রাজ্য মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সন লীনা গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, "গল্প অনুযায়ী রাহুল ও শ্বেতার পাড় ধরে যাওয়ার কথা নির্দিষ্ট করে বলা ছিল৷ অনেকসময় তো শিল্পীর মনে হয় আরেকটু বেটার কিছু করার, সকলের বাড়ি ফেরার তাড়া তাই ওকে বারণও করেছিল, আমি শুনেছি শ্বেতা এবং অন্য টেকনিশিয়ানদের থেকে। রাহুল নিজেই আরেকবার ড্রোন শট নিতে চেয়েছিল।" আর এই প্রসঙ্গেও কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সুদীপ্তা।
অভিনেত্রী লিখেছেন, "তুমি চুপ করে উড়তে থাকো, উড়ে উড়ে দূরে চলে যাও, আরও দূরে, অনেক দূরে, যেখানে তোমাকে আর ছোঁওয়া যাবে না। আমরা ড্রোন শটে ধরে রাখবো তোমার ওড়া। যদি টাল খেয়ে পড়ে যাও, তখন নাহয় বলে দেবো আমরা বলিনি, তুমিই উড়তে চেয়েছিলে, আমাদের স্ক্রিপ্টে ছিল না, তুমিই জোর করেছিলে। তোমাকে আমরা 'ভালো শিল্পী' বলে ডাকবো তখন, 'Perfectionist' বলে ডাকবো, আর 'ভালো শিল্পী' হবার লোভে তুমি উড়ে যাবে আরও দূরে, তারপর আর দেখা হবে না তোমার সঙ্গে। "
[বানান এবং লেখা অপরিবর্তিত রাখা হল ]
প্রসঙ্গত, রাহুলের মৃত্যু যেন শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, গোটা ইন্ডাস্ট্রির নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। এখন দেখার, তদন্তে কী উঠে আসে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়।















