একলা কন্যের খুশিয়াল কিসসা। ‘সিঙ্গল সালমা’ দেখে লিখছেন পরমা দাশগুপ্ত।
‘কুইন’ ছবিটার কথা মনে পড়ে? আদ্যন্ত রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ের বিয়ের দিনেই সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পরে সেই কন্যের একলা উড়াল দেওয়ার গল্প। সিনেমায় মন ভাঙা বিধ্বস্ত সেই মেয়ে, রানির নিজেকে নতুন করে খুঁজে পাওয়ার এক রোদমাখা সফর মন ছুঁয়েছিল সকলেরই।
প্রায় সেই একই আমেজ মেখে নেটফ্লিক্সে হাজির ‘সিঙ্গল সালমা’। লখনৌয়ের ঘিঞ্জি পথঘাট আর পারিবারিক বনেদিয়ানার অলিগলিতে এক একলা কন্যের জীবন-কোলাজ। যে ছবির শুরু থেকে শেষ জড়িয়ে আছে দায়িত্ব-কর্তব্য, সমাজের চাপিয়ে দেওয়া বোঝার ভার বয়ে চলা এক মেয়ের নিজেকে নতুন করে চেনার, নতুন করে জানার এবং সেই অচেনা ঝলমলে আমিকে দু’হাত বাড়িয়ে নিজের করে নেওয়ার এক মন ভাল করা উপাখ্যান।
এই ২০২৬-এ দাঁড়িয়েও এ দেশের শিরায় শিরায় এখনও অনেকটাই বয়ে চলে পুরুষতন্ত্রের দম্ভ। যে দেশের একটা বড় অংশ এখনও ভাবে মেয়ে মানেই বিয়ে করে সংসারী হওয়াটা তার ভবিতব্য। সমাজ, পরিবার, স্বামী যা বলবে, তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে নিজের আকাশ ছোঁয়ার ইচ্ছে, ভাল থাকার স্বপ্নগুলোকে পায়ের তলায় পিষে ফেলাটাই তার ধর্ম। হ্যাঁ, সমাজ খানিকটা বদলেছে ঠিকই, কিছু মেয়ে হয়তো সত্যি সত্যি পা রাখতে পেরেছে আলো-ঝলমলে পথে। তবু পারেনি-র খোপে থেকে যাওয়া মেয়েদের সংখ্যাটা আজও অনেক অনেক বেশি। গ্রাম-মফস্বল দূরে থাক, খাস শহরের আদ্যন্ত উদার পরিবারে বড় হয়ে, সংসারী হয়ে কোনও এক অলিখিত নিয়মে নিজের শর্তে বাঁচা হয়ে ওঠে না— এমন মেয়ের সংখ্যাও নেহাত কম তো নয়! সেখানে ছোট শহরের আপাদমস্তক রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে সবকিছুকে এক তুড়িতে উড়িয়ে নিজের শর্তে বাঁচছে, এমনটা এখনও অনেকের কাছেই অলীক সুখ। তাই সেটাই যদি সম্ভব হয়, দমবন্ধ করা নিয়মনীতির বেড়া ডিঙিয়ে একছুটে পৌঁছে যাওয়া যায় খোলা আকাশের কাছে, সে ভাললাগার স্বাদই আলাদা! হোক না পর্দায়, তবু সালমার, সালমাদের কাহিনির এটাই ম্যাজিক!
ছবির গল্পে লখনৌয়ের এক অস্তগামী আভিজাত্যের নবাব বংশের মেয়ে সালমা (হুমা কুরেশি)। তার বাবা (কনওয়ালজিৎ সিং) আজও নিজেকে নবাব বলেই মনে করেন। ভাঙাচোরা, বিবর্ণ হাভেলি ঋণের দায়ে বন্ধক দিতে হলেও শেরওয়ানি-নাগরার ঠাটবাটে, রক্ষণশীল মেজাজের গাম্ভীর্যে তিনি আজও পনেরো টাকার মাসোহারা আনতে যান। বংশের সলতে স্বরূপ উত্তরাধিকারের খোঁজে তিন মেয়ের পরে এক ছেলের জন্ম দিয়ে পরিবারকে অনায়াসে ঠেলে দেন অভাবের গ্রাসে। এহেন পরিবারের বড় মেয়ে সালমা অগত্যা পরিবারের জোয়াল কাঁধে পথ হাঁটে। তার নগরোন্নয়ন দফতরের সরকারি চাকরির টাকায় সংসার চলে, দুই বোনের বিয়ে হয়, ছোট ভাইয়ের শখআহ্লাদ মেটে, এমনকি ঋণের কিস্তিও। সালমা তাই নিজেকে নিয়ে ভাবার সময়টুকুও পায়না আর। মেয়ের বয়স তিরিশ পেরোলে তার বিয়ে দিতে হন্যে হয়ে ওঠেন মা। একের পর এক পাত্র আসে, নাকচ হয়। শেষমেশ তারই মতো পরিবারের কর্তব্যপালনে বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাওয়া, খানদানি মুসলিম পরিবারের ব্যবসায়ী সিকান্দারকে (শ্রেয়স তালপাড়ে) বিয়েতে রাজি হয়ে যায় সালমা। সিকান্দার তার সব শর্ত মানার পাশাপাশি তাকে প্রায় মাথায় করে রাখে! ইতিমধ্যে চাকরিসূত্রে লন্ডনে এক ট্রেনিং প্রোগ্রামে গিয়ে নিজেকে নতুন করে খুঁজে পায় সালমা। নিজেকে নিয়ে ভাবতে শেখে, নিজের পছন্দ-অপছন্দ, ভাল লাগা-খারাপ লাগাগুলোকে চিনতে শেখে। আর সেখানেই সে ভালবেসে ফেলে সদ্য আলাপ হওয়া সহকর্মী মিত(সানি সিং)-কে। সালমার জীবন এবার তবে গড়াবে কোন দিকে? যে সিকান্দার তাকে রানির মতো রাখতে চায়, তারই রাজত্বে কি পাকাপাকি বসত হবে সালমার? নাকি যে তাকে এগিয়ে দিল আলোর দিকে, পাল্টে দিল বেঁচে থাকার মানে, সেই মিতের হাত ধরেই সে এগিয়ে যাবে আগামীর পথে? সে উত্তর খুঁজতে চাইলে ছবিটা দেখতে হবে।
নারীর নিজেকে চেনা, পায়ের তলার জমি শক্ত করে নারীশক্তির জয়গানের গল্প বলার ক্ষেত্রে অনেক ছবি অজান্তেই খানিকটা নীতিকথার মতো হয়ে ওঠে। সে ফাঁদে পা দেওয়ার ভুলটা সযত্নে এড়িয়ে গিয়েছেন পরিচালক নচিকেত সামন্ত। ঘণ্টা আড়াইয়ের ছবি জুড়ে তাই শীতের রোদের মতো নরম উষ্ণতা, একরাশ ঝলমলে আলো আর ফুরফুরে এক আমেজ। বিশেষত, সালমার লন্ডন সফর-পর্বে যে রেশ ছড়িয়ে পড়ে মনের কোণে কোণে।
অভিনয়ে হুমা কুরেশি বরাবরের মতোই ভীষণ ঝলমলে, ভীষণ প্রাণবন্ত। তাঁর জন্যই সালমাকে জীবন্ত লাগে আরও। সালমার মতো মেয়েকে বাগদত্তা হিসেবে পেয়ে আহ্লাদে ভেসে যাওয়া, তার প্রতিটা পদক্ষেপে শক্ত করে হাতটা ধরে রাখতে চাওয়া সিকান্দারকে অবলীলায় বিশ্বাসযোগ্য করে তোলেন শ্রেয়স। কেরিয়ার-নাইটক্লাব-ফুর্তিবাজ জীবন-পারিবারিক বন্ধনকে এক সুতোয় গেঁথে রাখা মিতের চরিত্রে সানিও দারুণ। তলানিতে এসে ঠেকা বনেদিয়ানাকে প্রাণপণে আঁকড়ে রাখা নবাব সাহেব হিসেবে অনবদ্য কনওয়ালজিৎও।
চেনা ছকের জানা গল্প। চেনা দুঃখ, চেনা সুখের এমন কাহিনি পর্দায় নেহাত কম দেখেননি দর্শক। ‘সিঙ্গল সালমা’ তবে নতুন কীসে? না নতুন নয়, বরং কঠিন-জটিল প্লটের সিনেমা-সিরিজের ভিড়ে আদ্যোপান্ত সহজ, সরল মন ভাল করা আরও এক কাহিনি। বাস্তবে বহু সালমাকে হারতে দেখা, তাদের নিজের জীবনে নিজেকেই হারিয়ে ফেলতে দেখার অভ্যাসে এক মুঠো আলো ছড়িয়ে দেওয়ার মতো যার রেশটুকু। ছবির প্রথম অংশে লখনউয়ের এক বনেদি বংশের মেয়ের জীবন, তার রোজগেরে স্বাধীনতার কাহিনি ভারী সুন্দর গতিতে এগোলেও, দ্বিতীয়ার্ধে ‘কুইন’-এর সঙ্গে অনেকটা মিল খুঁজে পেতেই পারেন অনেকে। তবু প্রথমবার ছকভাঙা বন্ধুত্ব, প্রথম ওয়াইনে চুমুক, প্রথমবার সাহস করে সুইমস্যুটে সাগরজলের স্বাদ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করা সালমার সঙ্গে কোথাও যেন মিলেমিশে এক হয়ে যেতেই হয়! সেখানেই এ ছবির জাদু।
