পাহাড়ি বাঁকে মৃত্যুরহস্য। কোন সত্যির খোঁজ করল কুহেলি? সিরিজ দেখে লিখছেন পরমা দাশগুপ্ত।
পাহাড়ি স্বাদের হত্যারহস্য থ্রিলারপ্রেমী বাঙালি দর্শকের কাছে এখন আর নতুন কিছু নয়। নতুন নয় সম্পর্কের অলিগলি ধরে হাঁটা অপরাধের গল্পও। তবে দুইয়ের ঠাসবুনোট আর জমাটি অভিনয়ের মিশেলে যদি দর্শককে শেষ পর্যন্ত টানটান অপেক্ষায় বসিয়ে রাখা যায়, তবে মার্কশিটে ভাল নম্বর দিতে হয় বইকি! বাংলা ওটিটি-র আর পাঁচটা চেনা ছকের মার্ডার মিস্ট্রির ভিড়ে সেখানেই মন কাড়ছে ‘কুহেলি’। অদিতি রায়ের পরিচালনায় এই সিরিজে এ ছাড়াও আগাগোড়া দুর্দান্ত সঙ্গত দিয়ে গিয়েছে ড্রোন শটে ধরা পাহাড়ি বাঁক আর ছবির মতো দৃশ্য।
গল্পের শুরু রঙ্গিত এলাকার কুহেলি থানায় কর্মরত এসপি রানা সিংহের (কৌশিক সেন) ঝুলন্ত দেহ উদ্ধারের ঘটনায়। একাদশতম বিবাহবার্ষিকীর রাতেই এমন ঘটনায় রানার বিধ্বস্ত স্ত্রী রাধিকা (সুস্মিতা দে)-কে বরাবরের মতোই আগলে রাখে তার দিদি দেবিকা (ঋদ্ধিমা ঘোষ) এবং বোন ইশিকা (অঙ্গনা রায়)। ঘটনার তদন্তভার নেয় ডিএসপি অগ্নি (প্রিয়াঙ্কা সরকার)। সঙ্গী ওই থানারই কনস্টেবল হরিণ হাতি (দুর্বার শর্মা)। তিন বোনকে জিজ্ঞাসাবাদে উঠে আসতে থাকে নানা রকম তথ্য। ফ্ল্যাশব্যাকে দর্শকেরও পরিচয় হতে থাকে ভীষণ রকম নিষ্ঠুর, আদ্যন্ত শভিনিস্ট আলফা মেল রানার সঙ্গে।
জানা যায়, স্ত্রী ও দুই শ্যালিকার সঙ্গে তার সম্পর্ক ঠিক কোন খাতে বইছিল। ইতিমধ্যে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট জানিয়ে দেয় আত্মহত্যা নয়, খুন হয়েছে রানা। এদিকে, তার মদের আসরের সঙ্গী সিকান্দার (শুভ্রজিৎ দত্ত) বারবারই দাবি করতে থাকে, ইশিকাই আততায়ী। সে কি ঠিক কথা বলছে? নাকি অগ্নির তদন্তে কুয়াশার পরত সরিয়ে বেরিয়ে পড়বে অন্য কোনও সত্যি? শেষমেশ কি ধরা যাবে আততায়ীকে? সে সব নিয়েই গল্প এগিয়েছে সাত পর্বের এই সিরিজের।
মিনিট কুড়ি-বাইশের ছোট্ট ছোট্ট পর্ব। টানটান, নির্মেদ। অপ্রয়োজনীয় দৃশ্য বা সংলাপ, অহেতুক সাবপ্লট ছাড়াও যে একটা সিরিজকে মনোগ্রাহী করে তোলা যায়, তার প্রমাণ ছড়িয়ে পুরোটা জুড়েই। জমাটি পরিচালনা আর এডিটিংয়ের মুন্সীয়ানায় টিম ‘কুহেলি’র তাই নিঃসন্দেহে কুর্ণিশ প্রাপ্য।
সিরিজের কুশীলব যদি হন বলিষ্ঠ অভিনেতারা, তবে দর্শকমনে তা দাগ কাটতে বাধ্য। প্রথমবার ওটিটি পর্দায় পা রেখেই মন কেড়েছেন টেলিপর্দার জনপ্রিয় অভিনেত্রী সুস্মিতা। নরমসরম, ভীরুস্বভাব রাধিকা তাঁর হাত ধরেই জীবন্ত হয়ে ওঠে। ডিএম-এর স্ত্রী, পেশায় স্কুলটিচার, ব্যক্তিত্বময়ী দেবিকাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলেন ঋদ্ধিমাও। মাতৃত্বের কারণে বেশ কিছুদিন অভিনয় থেকে দূরে থাকার পরে এই সিরিজে তাঁরও প্রত্যাবর্তন। ঈশিকা হিসেবে বেশ লাগে অঙ্গনাকেও। একদিকে ভালবাসা, অন্যদিকে প্রতিশোধের অভিব্যক্তিতে অঙ্গনা অনন্য। তিন অভিনেত্রীর রসায়নের হাত ধরে পর্দায় তিন বোনের সম্পর্ক মন ছুঁয়ে যায়। বিপ্রতীপে অভিনয়ের জেল্লায় ঝকঝকে স্মার্ট ডিএসপি হিসেবে দারুণ লাগে প্রিয়াঙ্কাকেও।
পুরুষ চরিত্ররাই বা কম যাবেন কেন! রানার মানানসই ক্রূরতা-শীতলতায় যথারীতি দুর্দান্ত কৌশিক। স্ত্রী অন্য পুরুষের সঙ্গে ঘরছাড়া হওয়ার মানসিক বিপর্যস্ততার পাশাপাশি বন্ধুর পরিণতির সত্যসন্ধান- দুয়ের মিশেলে সিকান্দারকে জমাটি করে গড়েছেন শুভ্রজিৎও। এবং যাঁর কথা আলাদা করে বলতেই হয়, তিনি দুর্বার। তাঁর জন্যই রহস্যভেদের জটিলতাকে যখনতখন দুর্বার গতিতে কমেডিরসে সিক্ত করেছে হরিণ হাতি। যে নামটা শুনলেই এক চিলতে হাসি ছড়িয়ে যায় মনের ভিতরে। দেবিকা এবং ইশিকার স্বামীদের সংক্ষিপ্ত উপস্থিতিতে ইন্দ্রজিৎ চক্রবর্তী বা অনিন্দ্য চ্যাটার্জির অবশ্য তেমন কিছু করার ছিল না।
তবে খামতির খাতায় কয়েকটা ছোটখাটো বিষয় থেকেই যায়। যেমন, পাহাড়ি জনপদে ছোট্ট ক্যাফের মালিক ইশিকার আচার-আচরণ যেন বেশ খানিকটা ওভার দ্য টপ-ই বলা চলে। ইদানীং রানার মতো একই ধাঁচের চরিত্রে কৌশিকও এবার একটু স্টিরিওটাইপড হয়ে উঠছেন। তা ছাড়া, এসপি পদমর্যাদার অফিসারের কথাবার্তার ধরন এমন পাড়ার মস্তানসুলভ হবে কেন, সেটাও একটা প্রশ্ন। পাশাপাশি, পর্বগুলোর দৈর্ঘ্য ছোট রাখার তাগিদেই হয়তো চরিত্রগুলোর বুননও সংক্ষিপ্ত আকারে ধরা দিয়েছে। তিন বোন বা রানার চরিত্র কেন তাদের নির্দিষ্ট পথ ধরে হাঁটে, তার আরও একটু বর্ণনা থাকলেও মন্দ হত না। সিরিজের ক্লাইম্যাক্স ইঙ্গিত দিচ্ছে, আরও একটা সিজন আসবে এই কাহিনিতে। সে জন্যই কি তবে ছেঁড়া ছেঁড়া সুতো রেখে দিলেন পরিচালক-কাহিনিকার? সময় বলবে।
দর্শকদের আপাতত প্রত্যাশা একটাই। হইচইয়ের ট্র্যাডিশন মেনে সিরিজের দ্বিতীয় সিজন যেন অনন্তকাল অপেক্ষায় না রাখে!















