উদ্বোধন হয়ে গেল রানিকুঠি আঙ্গিক আয়োজিত পাঁচদিন ব্যাপী নাট্যোৎসব আঙ্গিক উৎসব। যাদবপুর অঞ্চলের মিলন পাঠচক্র ময়দানে রবিবার সন্ধ্যায় শুরু হয়ে গিয়েছে এই উৎসব। চলবে ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত। বিকেল থেকে রাত - প্রতিদিন তিনটি করে নাটক। নাট্যোৎসবের প্রধান আহ্বায়ক তথা নির্দেশক সুশান্ত মজুমদার। এই অনুষ্ঠানের অতিথি হিসেবে রবিবাসরীয় সন্ধ্যায় উপস্থিত ছিলেন বিভাস চক্রবর্তী, পৌলোমী চট্টোপাধ্যায়ের মতো বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব। ছিলেন এ প্রজন্মের অন্যতম জনপ্রিয় নাট্যব্যক্তিত্ব উদ্দালক ভট্টাচার্য। এবং পূর্বাঞ্চল সংস্কৃতি কেন্দ্রের প্রশাসনিক আধিকারিক অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায় ও রাজ্য একডেমির সদস্য সচিব ডঃ হৈমন্তী চট্টোপাধ্যায়।
দক্ষিণ কলকাতার একটি সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক সংগঠন ‘রানিকুঠি আঙ্গিক’। তাদের বহু কাজের মধ্যে একটি দিক নিরলস থিয়েটার চর্চা। গত ৩৩ বছর ধরে ‘বাতিঘর’, ‘ইন ক্যামেরা’, ‘গাঙপাড়’-এর মতো বহু মঞ্চ সফল প্রযোজনা এই নাট্যদল করেছে। মূলত, মানুষের কাছাকাছি থাকা যাওয়া, সুস্থ চিন্তা, সংস্কৃতি আগামী প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া এই সংস্থা আয়োজিত এই নাট্যোৎসবের প্রধান লক্ষ্য। তাঁদের মতে, থিয়েটারের দ্বারা এই মানবিক লক্ষ্যের কাছে পৌঁছনো বেশি করে সম্ভব। আর সেটা কোন ধরনের থিয়েটার? নাট্যোৎসবের দর্শন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সুশান্ত মজুমদার বলেন, “মানুষের কাছাকাছির থিয়েটার। এইমুহূর্তের অধিকাংশ থিয়েটার মানুষের কাছাকাছি পৌঁছোচ্ছে না। আর থিয়েটারের কথা, দর্শন যদি মানুষের অন্দরে না পৌঁছে দেওয়া যায়, তাহলে চেতনা এবং সামাজিক সুস্থ অবস্থান ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। অথচ এই ব্যাপারটি কিন্তু থিয়েটার করতে পেরেছিল একটা সময়ে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় বাদল সরকার, সফদার হাশমিদের নাম। ঠিক এই কারণেই প্রেক্ষাগৃহের পাকা মঞ্চের বাইরে এসে পাড়ায়-পাড়ায় থিয়েটারকে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছি আমরা। মানুষের মাঝখানে থিয়েটারকে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা।“

উদ্বোধনীর মূল সুর কিন্তু প্রথমেই বেঁধে দিয়েছিলেন বর্ষীয়ান নাট্যব্যক্তিত্ব বিভাস চক্রবর্তী। মঞ্চ থেকে ৯০ ছুঁয়ে ফেলা এই জনপ্রিয় শিল্পী জানালেন, যাঁরা থিয়েটার করেন তাঁরা যদি একসঙ্গে জোট বেঁধে যদি থিয়েটার না করেন তাহলে ভবিষ্যতে থিয়েটার শিল্পটাই কিন্তু বিপদের মুখে পড়বে। তার কারণ এখন ভেঙে-ভেঙে, বিভক্ত হয়ে থিয়েটার তৈরি হচ্ছে। সেটা করা সম্ভব হবে কি না, তা এখনই জোর দিয়ে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু যদি হয়, তাহলে তা আখেরে লাভ হবে থিয়েটারের, মানুষের, সমাজের।
সেই সুর টেনে বিশিষ্ট নাট্যকার-অভিনেত্রী পৌলোমী চট্টোপাধ্যায় বললেন, “কোনও সাংস্কৃতিক কাজ ধরে রাখা বা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া খুব কষ্টের। কারণ শিল্পীরা তো বিশেষ কিছু পান না। তাঁদের সামনে এগিয়ে নিয়ে চলে কাজ করার আনন্দটুকু। আমি নিজে দেখেছি, বুঝেছি শিল্পীর সেই আনন্দ, ভালবাসা কিন্তু একটা সময় বাকি মানুষদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত। আর সেখানেই এর সাফল্য। আর একটা কথা। থিয়েটার কিন্তু খুব গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়েছে। আমরা যাঁরা থিয়েটার করি, তাঁরা যদি শঙ্খ ঘোষের বলা কথামতো 'বেঁধে বেঁধে থাকি', যদি পরস্পরের হাত ধরে থাকি...বলতে চাইছি, একটা কমন প্ল্যাটফর্ম আসতে পারি, তাহলে সেটা সমাজের মঙ্গল। কারণ বর্তমান সময়ে ধর্মের নামে, রাজনীতির নামে ভয়ঙ্কর বিষাক্ত আবহাওয়া তৈরি হয়েছে তার বিরুদ্ধে কিন্তু মোকাবিলা করতে পারে এই থিয়েটার। তাই আমাদের এক হতে হবে। একসঙ্গে লড়তে হবে, নিজেদের ক্ষুদ্র চাহিদা ছেড়ে।”
অল্প কথায় অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায় বললেন, “পেশার সূত্রে আমি বিভিন্ন অঞ্চলে নিজে গিয়ে দেখেছি থিয়েটারে প্রচুর নতুন দল আসছে, এটা খুব আনন্দের কথা। নতুন ছেলেমেয়েরা থিয়েটারের প্রতি আগ্রহী হয়ে যোগ দিচ্ছে। বিশেষ করে মেয়েরা। এটা কিন্তু খুব আশার কথা।”
রাজ্য একডেমির সদস্য সচিব ডঃ হৈমন্তী চট্টোপাধ্যায় একই সুরে বললেন, “ এই বিপন্ন সময়ে থিয়েটারের কর্মীদের এক হয়ে লড়তে হবে। এই মঞ্চ থেকেই বিভাস চক্রবর্তী যে ডাক দিয়েছেন, সেই একই কথা আমিও বলব। একই সুরে।”

এরপর মঞ্চ ছাড়ার আগে বিভাস চক্রবর্তীর সামনে নতজানু হয়ে তাঁর পা ছুঁলেন সৌমিত্র-কন্যা। তৈরি হল মুহূর্ত। ততক্ষণে কচিকাঁচাদের নিয়ে থিয়েটার শাইন-এর নাটক জন্মান্তর-এর ফার্স্ট বেল পড়ে গিয়েছে। একটা একটা করে নিভে যাচ্ছে আলো। মঞ্চ থেকে শুরু করে বিরাট করে ম্যারাপ বাঁধা প্যান্ডেলের মধ্যে সমস্ত আলো। শুধুমাত্র জ্বলে রয়েছে মঞ্চের ওই একেবারে উপরে থাকা স্পটলাইট। পড়ল থার্ড বেল। ওই সামান্য সুরে ময়দানের চারপাশে ঘিরে থাকা বড় বড় সাউন্ড বক্সে মিহি স্বরে ডাকতে শুরু করল পাখিরা। মঞ্চে ধীরে-ধীরে, ঢিমে পায়ে ঢুকতে শুরু করেছে শিশুশিল্পীদের দল।
এরকমই টুকরো টুকরো মন ভাল করা মুহূর্তের কোলাজ নিয়ে শুরু হল ‘আঙ্গিক উৎসব’-থিয়েটারের এক হওয়ার স্বপ্নকে সামনে রেখে।
