রুপোলি পর্দার ঝলমলে আলো, কোটি কোটি ভক্তের উল্লাস আর গ্ল্যামারের চাকচিক্য— দূর থেকে দেখলে মনে হয় তারকাদের জীবন যেন রূপকথা। কিন্তু এই আলোর নিচেই যে কতখানি অন্ধকার লুকিয়ে থাকে, তা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানেন। গ্ল্যামার দুনিয়ার শিল্পীদের জীবনে নিঃশব্দে থাবা বসায় একাকীত্ব, কখন যে তা গভীর অবসাদে রূপ নেয়, তা টেরও পাওয়া যায় না। কেউ কেউ সেই অন্ধকারের দেওয়াল ভেঙে আবার জীবনের কোলাহলে ফিরে আসেন, আর কেউ কেউ হেরে গিয়ে বেছে নেন চরম কোনও পথ।
সম্প্রতি ‘আজকাল ডট ইন’-কে দেওয়া একটি অকপট সাক্ষাৎকারে নিজের জীবনের সেই অন্ধকার অধ্যায়, মানসিক অবসাদ এবং তা কাটিয়ে ওঠার উপায় নিয়ে মুখ খুললেন টলিউডের ‘ইন্ডাস্ট্রি’ প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়।
দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে টলিউডের সিংহাসন ধরে রাখা 'বুম্বাদা'কে অবসাদ নিয়ে প্রশ্ন করতেই তিনি খানিকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে যান। অতীতে ওঁর জীবনে ঘটে যাওয়া বহু ঝড়ঝাপটার কথা হয়তো ওঁর চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল। এরপর এক বুক দীর্ঘশ্বাস ফেলে অভিনেতা বলেন, “আমিও অনেক জায়গায়, অনেকভাবে হেরে গিয়েছি। এমন পরিস্থিতিও এসেছে যখন মনে হয়েছে— এই পরিস্থিতিতে লোকের সামনে কীভাবে যাব? সবার মুখোমুখি কীভাবে হব? আবার অনেক সময় এও মনে হয়েছে, আমি আর বোধহয় পারব না... আর জানেন তো, এটা খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার।”
প্রসেনজিৎ মনে করিয়ে দেন, এই মানসিক দোলাচল বা হেরে যাওয়ার অনুভূতি শুধু যে অভিনয় জগতের শিল্পীদের হয়, তা নয়। যেকোনও পেশার সফল মানুষদের ক্ষেত্রেই এটা ঘটতে পারে।সাফল্যের এক নির্মম সত্যকে তুলে ধরে বুম্বাদা বলেন, চূড়ায় পৌঁছানোর যেমন আনন্দ আছে, তেমনই আছে এক অদ্ভুত একাকীত্ব ও লড়াই। ওঁর কথায়, “একটা কথা আমাদের মাথায় রাখতে হবে যে সাফল্য পাওয়ার কিন্তু আরও একটি দিক আছে। কেউ সাফল্য পেলে তাঁকে উল্টোদিক থেকে অনবরত টানা হবে, যাতে ওঁর সাফল্যের খেতাবটা মুছে দেওয়া যায়। তাই জন্য সেই ক্ষেত্রে আমার বারবার মনে হয়— হেরে যাওয়াটা কোনও কাজের কথা নয়। একেবারেই নয়।”
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে এত খোলাখুলি আলোচনা হলেও, আজ থেকে ১৫-২০ বছর আগে পরিস্থিতি এমন ছিল না।প্রসেনজিৎ জানান, সেই সময়ে যখনই ওঁর মনে এই ধরণের নেতিবাচক বা হেরে যাওয়ার ভাবনা আসত, তখন তিনি নিজেকে এক অন্য উপায়ে বোঝাতেন।তিনি বলেন, “আমি নিজেকে বলতাম, এই পৃথিবীতে আমার থেকে অনেক বেশি মানুষ আছেন, যাঁদের লড়াইটা আমার চেয়ে অনেক গুণ বেশি কঠিন। অনেকটাই কঠিন। তাহলে তাঁরা যদি প্রতিদিন লড়াই করে বেঁচে থাকতে পারেন, আমি কেন পারব না? সেই দিক থেকে দেখতে গেলে তাঁদের তুলনায় তো আমি অনেক দিব্যি আছি, অনেক ভাল আছি! তাহলে? আমার মনে হয়, এই লড়াই করাটা খুব প্রয়োজন। আর যেটুকু ঈশ্বর জীবনে দিয়েছেন, তাকে আগলে রেখে আনন্দে থাকা।”
সাক্ষাৎকারের একেবারে শেষে এসে টলিপাড়ার অভিভাবক বর্তমান প্রজন্মের উদ্দেশ্যে এক মস্ত বড় বার্তা দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, অবসাদ কাটানোর সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি হল ‘মনের শান্তি’ ।
চারপাশের নেতিবাচকতা বা ট্রোলিং কালচারকে উপেক্ষা করার মন্ত্র দিয়ে প্রসেনজিৎ বলেন— “জীবনের চারপাশে তো শুধুই নেগিটিভিটি, কিন্তু সেই ঘেরাটোপের মধ্যেও পজিটিভিটিটুকু যদি আমরা খুঁজে নিই, তাহলেই চলবে। ঐটুকু আমাদের করতেই হবে। অবসাদ কাটানোর এই মন্ত্রেই আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি।”















