রাহুল অরুনোদয় ব্যানার্জির মৃত্যুকে কেন্দ্র কিরে উত্তাল টলিউড৷ আর্টিস্ট ফোরামের পক্ষ থেকে রাহুলের মৃত্যুর সঠিক এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে মিছিল করা হয়েছে৷ সুরক্ষার দাবিতে কর্মবিরতিও পালন করা হয়েছে৷
টলিউডের সকলে রাহুলের মৃত্যুর প্রতিবাদে পাশে থাকার জন্য সকলকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন প্রিয়াঙ্কা। প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জি একাধিকবার সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন, এই লড়াই সকলের, অভিনেতা অভিনেত্রী কলাকুশলীরা মিলে একটাই পরিবার৷ সেই পরিবার রাহুলের মৃত্যুর তদন্ত চায়৷ সত্যিটা জানতে চায়৷ প্রিয়াঙ্কা সরকারের সেই একই দাবি৷ ৭ এপ্রিলের উল্লেখ করে প্রিয়াঙ্কা বলেন, একই ভাবনা, একই চিন্তা আর অফুরন্ত ভালবাসায় যেন একটাই পরিবার৷
রাহুলের মৃত্যু যে সকলকে ঐক্যবদ্ধ করেছে সেকথাও জানিয়েছেন প্রিয়াঙ্কা৷ পাশাপাশি আক্ষেপের সুর তাঁর লেখায়৷ মৃত্যুর পর নিজের সম্মান আর মর্যাদার জন্য এমন লড়াই যেন আর কাউকে কখনও লড়তে না হয় সেকথাও লিখেছেন প্রিয়াঙ্কা। প্রিয়াঙ্কা লিখেছেন,
"ধন্যবাদ জানাই সকলকে, এই কঠিন সময়ে আমাদের পাশে থাকার জন্য। গত ৭ তারিখে গোটা চলচ্চিত্র পরিবার যেন এক সুরে বাঁধল নিজেদের—একই ভাবনা, একই চিন্তা আর অফুরন্ত ভালোবাসায়।
এখানে কোনো বিভাজন নেই, কোনো রাজনৈতিক রং নেই; নেই কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ বা আমিত্বের সংঘাত। এখানে শুধু একটাই সত্য—আমরা একটি পরিবার। পরিবারেরই একজন সদস্যের প্রতি গভীর স্নেহ আর মমতা থেকেই আজকের এই ঐক্যবদ্ধ লড়াই।
রাহুলকে কেউ অভিনেতা হিসেবে ভালোবেসেছেন, কেউ চেনেন অরুণোদয় হিসেবে, আবার কেউবা ভালোবেসেছেন লেখক রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়কে। একটি মৃত্যু আজ আমাদের গোটা পরিবারকে এক সুতোয় গেঁথে দিল।
তবে এই অকাল প্রয়াণ যেন নিছক একটি শোকের স্মৃতি হয়ে না থাকে; এটি যেন আরও বড় কোনো পরিবর্তনের সূচনা করে। তবেই এই মানুষটি আমাদের মাঝে অমর হয়ে থাকবেন, এটাই হবে তার প্রকৃত উত্তরসূরি বা লেগাসি। আমাদের লক্ষ্য হোক একটাই—ভবিষ্যতে যেন এমন দুর্ঘটনা আর না ঘটে। টেকনিশিয়ান হোন বা শিল্পী—মৃত্যুর পর নিজের সম্মান আর মর্যাদার লড়াই যেন কাউকে লড়তে না হয়।"
২৯ মার্চ ভোলেবাবা পার করেগা ধারাবাহিকের শুটিং করতে গিয়ে মৃত্যু হয়েছে রাহুল অরুনোদয় ব্যানার্জির৷ রাহুলের মৃত্যুর তদন্তের দাবিতে আর্টিস্ট ফোরামের পক্ষ থেকে প্রযোজনা সংস্থাকে চিঠি পাঠানো হয়েছিল। মৃত্যুর কারণ জানতে চাওয়া হয়েছিল৷ আশানুরূপ উত্তর পাওয়া না যাওয়ায় এবার এফআইআর করেছেন আর্টিস্ট ফোরামের সদস্যরা৷ উপস্থিত ছিলেন প্রিয়াঙ্কা সরকার৷
প্রিয়াঙ্কার সঙ্গে আর্টিস্ট ফোরামের সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ভরত কল, চিরঞ্জিৎ চক্রবর্তী, শান্তিলাল মুখার্জি, সৌরভ দাস, লাবণি সরকার, বাসবদত্তা চ্যাটার্জি, বিদীপ্তা চক্রবর্তী, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জি.
রাহুলের মৃত্যুতে উঠেছে একাধিক প্রশ্ন৷ প্রযোজক সংস্থার বক্তব্যে অসঙ্গতি নিয়েও তুমুল আলোচনা সময়াজমাধ্যমে৷ ড্রোন শট না থাকলে কেন রাহুল জলে নামবেন? রাহুল যখন জলে ডুবে যাচ্ছেন তখন কেন কোনও জরুরি সুরক্ষা ব্যবস্থা ছিল না এই সব বিষয় উঠেছে একাধিক প্রশ্ন.
আর্টিস্ট ফোরামের তরফে বিবৃতিতে জানানো হয়, "গত রবিবার ২৯ মার্চ বিকেলবেলা ওড়িশার তালসারিতে ভোলে বাবা পার করেগা নামক সিরিয়ালের শুটিং করতে গিয়ে আমাদের সংগঠনের সদস্য ও বিখ্যাত অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় দুর্ঘটনা কবলিত হয়ে সমুদ্রের জলে ডুবে মারা যান। তাঁর মা, স্ত্রী, পুত্রের সঙ্গে গুণমুগ্ধ দর্শক এবং বন্ধুরা শোকে হতবাক। আমরা তাঁর পরিবারের পাশে থাকতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।"
ম্যাজিক মোমেন্টসের তরফে বিবৃতিতে লেখা হয়, "আমরা, ম্যাজিক মোমেন্টস মোশন পিকচার গভীরভাবে শোকাহত আমাদের কলিগ রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে। আমরা ইতিমধ্যেই আমাদের কলাকুশলীদের সঙ্গে কথা বলা শুরু করেছি। কিন্তু তাঁদের অধিকাংশই ট্রমাটাইজড, সেদিন ঠিক কারণে এটি ঘটেছিল সেটা নিশ্চিত করে বলার জন্য। আমরা আর কিছুদিন সময় চাইছি ওদের বয়ান আরও সুসংগঠিত ভাবে নেওয়ার জন্য। যাতে বিভিন্ন ধরনের যে বয়ান সামনে আসছে সেই বিভ্রান্তি দূর হয়। আমরা একটি পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট পেশ করব।" ম্যাজিক মোমেন্টস দাবি করেছে তাঁরা সম্পূর্ণ নিরাপত্তার দিক মাথায় রেখে, অনুমতি নিয়েই শুটিং করছিল। তারপরেও এই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে।
প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জি বলেন, "বুম্বাদা হিসাবে অনুরোধ করছি, ইন্ড্রাস্ট্রি নিয়ে অনেক কথা ওঠে, এই ভাগ ওই ভাগ৷ ছেলেটা চলে গিয়ে আমাদের সবাইকে এক করেছে৷ আমরা চাই এমন একটা সিস্টেম তৈরি করতে, আমাদের পরিচালক, প্রযোজক, অভিনেতা, কলাকুশলী মিলে সুরক্ষিত থাকব৷ "
স্বরূপ বিশ্বাস বলেন, "সকলেই তাঁর বেস্ট দেওয়ার চেষ্টা করেন৷ এই ইন্ড্রাস্টি বাঁচাতে আমরা সকলে চাই৷ যে এগারো হাজার সদস্যের কথা বলা হচ্ছে, তাঁদের পরিবার পিছু ৪ জন করে ৪৪০০০ তো নয়, চা জল দেয় আরও নানা কাজে কত লোক যুক্ত, এতগুলো মানুষ যেখানে একসঙ্গে কাজ করছেন সেখানে যদি সেফটি না থাকে তাহলে রাহুলের মতো গুণী শিল্পীদের আমরা হারিয়ে ফেলব৷ আমরা সকলে ঐক্যবদ্ধ, যে এর জন্য একটা এসওপি করা দরকার৷ কারণ আমরা শিল্পীকে বলব, শিল্পী পরিচালকে বলবে, পরিচালক প্রযোজককে বলবে, এর দায়ভার কে নেবে?
ভাইস প্রেসিডেন্ট ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত বলেন, " এটা আমাদের মানবিকতার লড়াই। শিল্পীরা আবেগপ্রবণ কিন্তু আবেগের পাশাপাশি সুরক্ষার বিষয়ে ভাবতে হবে৷ সেইজন্য আমরা জীবনের জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়েছি। রাহুল যেভাবে আমাদের ছেড়ে চলে গেল সেটা কখনই কাম্য নয়৷ আমরা শেষ অবধি লড়ব৷ জানতে চাইব কেন এমন হল? রাহুল আমাদের সকলকে এক করে দিয়ে গেছে, প্রশ্ন তুলে দিয়েছে যে আমরা কি সত্যিই সিকিওর? না আমরা সিকিওর নই।"
ম্যাজিক মোমেন্টস-এর ধারাবাহিক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কেউ কেউ তদন্ত চালু রাখার পাশাপাশি কাজ করার দাবিও জানিয়েছেন৷
ঐক্যবদ্ধ হয়ে আর্টিস্ট ফোরাম বা টলিউড সহজ-প্রিয়াঙ্কার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই লড়াইয়ে কতদূর যাবেন, এবং এই লড়াই সুরক্ষাবিধিতে কী কী পরিবর্তন আনবে, বাংলা বিনোদনের খোলনলচে বদলাবে কি না সেই উত্তর সময় বলবে৷















