‘গুপী গাইন ও বাঘা বাইন’ ছবি দেখেননি, এমন বাঙালি প্রায় নেই বললেই চলে। বিশেষ করে সেই বাঙালি যদি ভারতে থাকেন। খুব স্বাভাবিকভাবেই সেই ছবির বিখ্যাত গান ‘ভূতের রাজা দিল বর’-ও অতি পরিচিত বাঙালির কাছে। তাই সেই গানের সুর এবং কথা যদি আচমকা এইমুহূর্তে প্রথম সারির বলি নায়কের গানের মধ্যে শোনা যায়, প্রথমে অবাক লাগে। এবং সত্যজিতের সেই কালজয়ী সুর ও গান যদি ঠিকমতো সম্পৃত্ত না হয় হিন্দি গানে তা সে যতই শ্রদ্ধার্ঘ্য-র মোড়কে মুড়িয়ে ফেলা হোক না কেন, তাহলে খানিক বিরক্ত-ই লাগে।
খুলেই বলা যাক বিষয়টি। অক্ষয় কুমার ও প্রিয়দর্শনের জুটির আসন্ন ছবি ‘ভূত বাংলা’ নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। এই উত্তেজনায় আরও ঘি ঢালল ছবির প্রথম গান মুক্তি।
গত সপ্তাহে প্রকাশ পেয়েছিল ছবির প্রথম গান ‘রাম জি আকে ভলা করেনগে’— যেখানে অক্ষয় কুমারকে দেখা গেল তাঁর পুরনো চেনা কমিক এনার্জিতে। পাগলামি, ভুল ভুলাইয়া ছবির নস্ট্যালজিয়া এই মিলিয়ে গানটি যেন ভূতুড়ে দুনিয়ার মজাদার জগতের এক ঝলক। তবে এখানেই ভুরু কুঁচকেছে শ্রোতা-দর্শকরা। আর এই গানের অন্তরাতেই শোনা গেল “আহা ভূত, বাহা ভূত, কিবা ভূত, কিম্ভূত! বাবা ভূত, ছানা ভূত, খোঁড়া ভূত, কানা ভূত কাঁচা ভূত, পাকা ভূত, সোজা ভূত, বাঁকা ভূত...” এর কথাগুলোই। বাংলা গানটির সেই অতিপরিচিত সুরে।
গানটির সুর করেছেন প্রীতম, গীতিকার কুমার। কণ্ঠ দিয়েছেন আরমান মালিক ও আরভান । পাশাপাশি মেলো ডি-র ব়্যাপ গানটিকে দিয়েছে আধুনিক ছোঁয়া। গান প্রকাশের পর সামাজিক মাধ্যমে আবেগঘন পোস্ট করেন প্রীতম। তিনি জানান, এই গানটি কিংবদন্তি পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের সিনেমাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তৈরি। এই গান যে তাঁর শৈশবের স্মৃতিও ফিরিয়ে এনেছে আর সেই নস্ট্যালজিয়াকে সুন্দরভাবে গেঁথে দিয়েছেন গীতিকার কুমার, সেকথাও জানিয়েছেন প্রীতম। এখানেই শেষ নয়। প্রীতম এই গানের আরও একটি ভার্সন তৈরি করতে ইচ্ছুক। এবং সেই সংস্করণটি নীরজ শ্রীধরকে নিয়েই করতে চান।
এবার এই গান বিতর্কে এবার সরাসরি বিস্ফোরক মন্তব্য করলেন ‘চালচিত্র’ ছবি খ্যাত পরিচালক প্রতিম ডি গুপ্ত। সুরকার প্রীতম ও আসন্ন ছবি -র নির্মাতাদের কড়া ভাষায় আক্রমণ করে ফেসবুকে দীর্ঘ পোস্ট করলেন তিনি।
ফেসবুক পোস্টে প্রতীম ডি গুপ্ত কার্যত ক্ষোভ উগরে দিয়ে লিখেছেন, “না প্রীতমদা, ‘রাম জি আকে ভলা করেনগে’ কোনও ‘ট্রিবিউট’ নয়। এটা আমাদের শৈশবের সবচেয়ে পবিত্র গানগুলোর একটি—‘ভূতের রাজা দিল বর’-এর নির্লজ্জ, নোটে-নোটে লুঠ।”
পরিচালকের কথায়, এই গান শুধু সুর বা ছন্দ নয় এটা বাঙালির আত্মার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক স্মৃতি, যা অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে মানুষের মনে বেঁচে আছে। অথচ সেই সুর, সেই তাল, সেই খেয়ালি ভূতদের তালিকা সবকিছুই নাকি প্রায় হুবহু কপি করে তার উপর অভিনেতা অক্ষয় কুমারের নাচ বসিয়ে দেওয়া হয়েছে।
পোস্টে তিনি আরও কড়া ভাষায় লেখেন, “এটাকে আবার ‘ট্রিবিউট’ বললে আমার বমি চলে আসবে। যদি সত্যজিৎ রায় বেঁচে থাকতেন, তাহলে তিনি আপনাদের প্রত্যেককে—পরিচালক, সুরকার, প্রযোজক, তারকা সবাইকে কলার ধরে টেনে এনে প্রকাশ্যে আপনাদের সৃষ্টিশীল দেউলিয়াত্ব দেখিয়ে দিতেন।”

এখানেই থামেননি তিনি। প্রতীমের অভিযোগ, বহু কোটি টাকার বলিউড নাকি বারবার আঞ্চলিক সিনেমার সৃজনশীলতাকে শুষে নিয়ে টিকে আছে। তাঁর ভাষায়, “এটা সম্মান নয়। এটা সাংস্কৃতিক কবর লুট, তার উপর একটা আইটেম নাম্বার চাপিয়ে দেওয়া।”
এই মন্তব্য ঘিরেই সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক। অনেক নেটিজেনই প্রতীম ডি গুপ্তর বক্তব্যকে সমর্থন করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এক নেটিজেন লিখেছেন,“একদম ঠিক বলেছেন। আমাদের পুরো শৈশবকে টেনে এনে সস্তা কমার্শিয়াল আইটেম নাম্বারে পরিণত করা হয়েছে। শুধু বাঙালির আবেগকে খোঁচা দেওয়ার জন্যই এই ব্যবহার। সত্যজিৎ রায়কে বহুবার ব্যবহার করা হয়েছে, কিন্তু এবারটা যেন একেবারে ধর্মদ্রোহের মতো।”
তবে অন্য একটি অংশ আবার বলছে, এটি হয়তো নির্মাতাদের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানানোরই চেষ্টা।
যদিও বিতর্ক এখনও থামার নাম নিচ্ছে না। আর তার মধ্যেই আবারও সামনে উঠে এসেছে সেই চিরচেনা প্রশ্ন —বলিউড কি সত্যিই বারবার বাংলার সাংস্কৃতিক সম্পদকে ধার করে না কি সেটাই ‘শ্রদ্ধা’ জানানোর ভাষা?
