৫ই জুলাই, রবিবার ভারতের শিল্প ও সংস্কৃতি জগতের এক সোনালী অধ্যায়ের অবসান হল। ছত্তীসগঢ়ের প্রাচীন লোকসংস্কৃতি ‘পাণ্ডবানি’ — যা মূলত মহাভারতের সাঙ্গীতিক আখ্যান, তাকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দেওয়া কিংবদন্তি শিল্পী ড. তীজন বাঈ আর নেই। রায়পুরের অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস (AIIMS)-এ দীর্ঘ রোগভোগের পর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭০ বছর।

লাল ছত্তীসগঢ়ী শাড়ি, হাতে তানপুরা আর সেই চেনা সিংহগর্জন— যার একক পারফরম্যান্সের সামনে এক লহমায় জীবন্ত হয়ে উঠত কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্র বা দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের দৃশ্য। মহাভারতের সেই সুরের জাদুকর তীজন বাঈ আজ অনন্তের পথে পাড়ি দিলেন। গত ২৭শে মে থেকে রায়পুর এইমসে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। আজ তাঁর প্রয়াণে শোকস্তব্ধ গোটা দেশ। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি থেকে শুরু করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং ছত্তীসগঢ়ের মুখ্যমন্ত্রী বিষ্ণু দেব সাই গভীর শোকপ্রকাশ করেছেন।

১৯৫৬ সালের ২৪শে এপ্রিল ছত্তীসগঢ়ের দুর্গ জেলার এক অতি সাধারণ পরিবারে জন্ম তীজন বাঈয়ের। যে ‘পাণ্ডবানি’ শিল্পকলা ঐতিহ্যগতভাবে কেবল পুরুষদের একচেটিয়া অধিকার ছিল, শৈশব থেকেই সমস্ত সামাজিক ছুঁৎমার্গ আর স্টিরিওটাইপ ভেঙে তাতে নিজের অধিকার কায়েম করেছিলেন তীজন। তাঁর সেই গমগমে কণ্ঠস্বর, অসাধারণ বাচনভঙ্গি এবং একক অভিনয়ের দাপটে শুধু ভারত নয়, জাপান, ব্রিটেন, ফ্রান্সসহ গোটা বিশ্বের দর্শক বারবার মন্ত্রমুগ্ধ হয়েছেন।

পর্দায় বা ওটিটির যুগে দাঁড়িয়ে যেখানে লোকশিল্প ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে, সেখানে তীজন বাঈ নিজের শিকড়কে ধরে রেখে আন্তর্জাতিক স্তরে যে উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, তা সমকালীন সংস্কৃতির ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

 এই শিল্পীর প্রয়াণকে দেশের সংস্কৃতির জন্য এক ‘অপূরণীয় ক্ষতি’ বলে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এক্স-এ তিনি লেখেন, “বিখ্যাত পাণ্ডবানি গায়িকা তীজন বাঈ'জির প্রয়াণে আমি গভীরভাবে শোকাহত। নিজের অসাধারণ পারফরম্যান্সের মাধ্যমে তিনি ছত্তীসগঢ়ের লোকশিল্পকে এক অনন্য বিশ্বজনীন পরিচিতি দিয়েছিলেন।”

অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু তাঁর শ্রদ্ধাজ্ঞাপনে লেখেন, “নিজের অসাধারণ প্রতিভা, নিষ্ঠা এবং বছরের পর বছর সাধনার মাধ্যমে তিনি ভারতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ছড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর এই অবদান চিরস্মরণীয় থাকবে।”

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে তীজন বাঈ কেবল একজন লোকশিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন নারী শক্তির এক জলজ্যান্ত প্রতীক, যিনি প্রমাণ করেছিলেন নিজস্ব সংস্কৃতির জোর থাকলে মাটির কুঁড়েঘর থেকেও বিশ্বজয় করা সম্ভব। তানপুরা হাতে তাঁর সেই চিরপরিচিত বাঘিনীর মতো পোজ চিরকালের জন্য খোদাই হয়ে রইল ভারতীয় সংস্কৃতির ইতিহাসে।