স্রেফ নিজের বুকের মধ্যে থাকা আলোটাকে সম্বল করে নীলচে অন্ধকারের স্মৃতি ছিঁড়ে কি বেরিয়ে আসতে পারে মানুষ? ফেলে আসা ছোটবেলা, আজন্ম বাবার প্রতি অভিমানকে পুড়িয়ে ভালবসা ভর্তি আকাশপ্রদীপ উড়িয়ে দিতে পারে কি সে? অন্যদিকে, এই জীবনে ফুরিয়ে যাওয়ার আগে এক জন্মের দুঃখ, বুঝে না উঠতে পারা ভালবাসাকে টপকে ছেলের কাছে এক বুক মায়া নিয়ে নতুন করে কি দাঁড়াতে পারেন কোনও বাবা? তাঁরা কি পরস্পরের হাত ছুঁয়ে ফিরে যেতে পারেন নিজেদের লেখা কোনও রূপকথার কাছে? তার-ই গল্প শোনায় ‘ফেরা’।

আমাদের মধ্যবিত্ত বাঙালি জীবনে ছেলেদের কাছে বাবারা বন্ধু হন কম। কাউকে ভয় লাগে, কাউকে পোষায় না আর কেউ বা আজন্ম ঘষা কাচের পিছনে থেকে যায় ঝাপসা কোনও মানুষের মতো। মায়া-অনুকম্পা-স্নেহহীন সেই দূরত্ব ইলাস্টিকের মতো বাড়তে বাড়তে এক মহাদেশের মতো এত বেড়ে যায় যে কোনও দোয়েল সাঁকো-ও আর তাদের পার করতে পারে না। তারপর? 'ফেরা'তে সঞ্জয় মিশ্র এবং ঋত্বিক চক্রবর্তী বলেন সেই ‘তারপর’-এর কথা।

ছবির গল্প, টুইস্ট ফাঁস করার জায়গা এই পোস্ট নয়। তার থেকে বরং একটু বলা যাক বাবা-ছেলের কথা। ছেলের অভিমান, খারাপ লাগা বুকে ধারালো ছোরার মতো বিঁধে চললেও এক গোটা জীবনে বাবারা বলে উঠতে পারেন না ‘আমি নিজের জন্য কী কী করতে চেয়েছিলাম, পারতাম-ও কিন্তু সংসারের জন্য পেরে উঠিনি’...এবং সঞ্জয় মিশ্র-ও বলেননি। কিন্তু ওঁর চোখ বলেছেন। নিঃশব্দে ফেলা দীর্ঘশ্বাসের তীব্রতা বুঝিয়েছে। আর সজোড়ে থাপ্পড় পড়েছে দর্শকাসনে বসা প্রতিটি পুত্র সন্তানের গালে। হৃদয় চুঁইয়ে পড়েছে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত।  সঞ্জয় মিশ্র রাগ করছেন, অভিমানে চিৎকার করছেন, অর্থহীন হুমকি দিচ্ছেন আর বাবাকে খুঁজে পাচ্ছি তার মধ্যে। তখন তাঁর উচ্চারণে সামান্য বাংলা টান শুনে কেউ যদি কাঁইকাঁই করে ওঠে, ওই মুহূর্তে তাঁকে প্রেক্ষাগৃহ থেকে বের করে দেওয়া উচিত। 

পর্দায় ঋত্বিক কেন ঋত্বিক, তা যদি বলতে বসি তাহলে সাংবাদিকতা এইমুহুর্তে ছেড়ে দেওয়া উচিত আমার। শুধু এটুকু না বললেই নয়, একপ্রস্থ কথা-কাটাকাটির পর সঞ্জয় মিশ্র যখন অসুস্থ হয়ে বেকায়দায়, সেই ঋত্বিক-ই এই নীল গ্রহের যাবতীয় সব ছেড়েছুড়ে তার জন্য ছুটেছেন। ঠিক যেমন প্রায় কোনওদিন না পাওয়া বাবার স্নেহের জন্য মনের ভিতরে কাঙাল ছেলেটি কাঠি আইসক্রিম নিয়ে আসে সেই বাবার জন্য, গলায় দলা পাকিয়ে ওঠে কান্না। এটাই তো বাবার জন্য আমিও করতে চেয়েছি, চাই কিন্তু কই পেরে উঠি না। যখন সবার সামনে বাবা হেরে যাচ্ছে দেখে হেলায় নিজের সর্বস্ব পুঁজি পণ করে যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়ায় ঋত্বিক, তখন আশ্চর্য কোনও জাদুকাঠির ছোঁয়ায় তিনি এক হয়ে যান ‘দ্য জাজ’-এর রবার্ট ডাওনি জুনিয়রের সঙ্গে। আর ঠিক তখনই ‘দ্য জাজ’-এ ছেলের জন্য এক আকাশ স্নেহ আপামর কাঠিন্যের মোম কাগজে মুড়িয়ে রাখা রবার্ট ডুভাল-এর সঙ্গে এক বেঞ্চে টুক করে বসে পড়েন সঞ্জয় মিশ্র-ও। 

আসলে, এই জীবনে অন্তত একবার হলেও যে কোনও ছেলে চায়, তার বাবা জিতুক। সুপারহিরো হয়ে দাঁড়াক সবার জন্য। একদম সবার সামনে। আর সে এক বুক ভরা গর্ব নিয়ে বাবার জন্য হাততালি দেবে, সিটি বাজাতেই থাকবে। চিৎকার না করেও সব্বাইকে বোঝাবে- “ওরে দ্যাখ, দ্যাখ, এই হচ্ছে আমার বাবা!”
বাবার জন্য শত অভিমানের শেষেও সে এটাই চায়। এটাই এই পৃথিবীর নিয়ম। বাবা-ছেলের সম্পর্কের নিয়ম। প্রকৃতির ঠিক করে দেওয়া নিয়ম। ঠিক যেমন করে সে লুকিয়ে-লুকিয়ে চায়, বাবার পুরনো জামার, ওল্ড স্পাইস শেভিং ক্রিম, সস্তা পাউডারের গন্ধ লেগে থাকুক তাঁর শরীর-মনেও। 

আমার দৃঢ় বিশ্বাস বাবারাও এটা বোঝেন। আমরা ছেলেরা শুধু করে উঠতে পারি না। মুখ ফুটে কিছু বলতে পারি না। জাপটে ধরে উঠতে পারি না।  তাই আর আমাদের ফেরা হয়ে ওঠে না বাবার কাছে। আর তাই যখন ফিরতে চাই ততক্ষণে অনেকটা দেরি হয়ে যায়।

পরিচালক পৃথা চক্রবর্তীর এই ছবি যত্ন করে মনে করিয়ে দেয়, বাবার কাছে ফেরাটা আমাদের প্রয়োজন। বাকি জীবনে অ্যাটলাসের মতো এক আকাশ আফশোস কাঁধে বয়ে বেড়ানোর থেকে অনেক বেশি জরুরি। অনেক বেশি। যতটা না বাবার, তার থেকে অনেক বেশি আমাদের!

আজ, বহু বছর পর শুধু বাবার জন্য সব ছেড়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে বড্ড ইচ্ছে করছে।