রাজ্যের নানান জায়গায় সাড়ম্বরে পালিত হচ্ছে স্বামী বিবেকানন্দের জন্মবার্ষিকী। এই উপলক্ষে রাজ্যজুড়ে দিনভর রয়েছে নানান অনুষ্ঠান। শহরের বিভিন্ন স্কুলের তরফে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে প্রভাতফেরী ও শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়েছিল। এহেন আবহে আজকাল ডট ইন যোগাযোগ করেছিল অভিনেতা সাহেব চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। ২০০৩ সালে জনপ্রিয় বাংলা ধারাবাহিক ‘আলোকিত এক ইন্দু’-তে স্বামী বিবেকানন্দের চরিত্রে অভিনয় করে রাতারাতি বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে গিয়েছিলেন সাহেব। এরপর একাধিক সফল ধারাবাহিক ছুঁয়ে বড়পর্দা সফরের মধ্যেই ২০১৩ সালে সিডনি অপেরা হাউজে অ্যালেক্স ব্রুনের নাটক ‘ওয়াননেস ভয়েস উইদআউট ফর্ম’-এ স্বামী বিবেকানন্দের চরিত্রে অভিনয় করেন। পশ্চিমে স্বামীজীর বিরাট কর্মকাণ্ড-ই ছিল সাড়ে তিন ঘন্টার এই থিয়েটারটির মূল নির্যাস।
সাহেব চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, “২০০৩ সালে ‘আলোকিত এক ইন্দু’-তে স্বামীজীর চরিত্রে অভিনয়ের সময়ে আমি তখন যুবক। স্বভাবতই অভিনয়ে অতটাও দড় হইনি। তবে প্রাণপণে পরিচালকের কথা শুনে চলার পাশাপাশি স্বামীজী সংক্রান্ত বহু বই পড়েছিলাম। এবং মন দিয়ে পড়েছিলাম। যতটুকু সম্ভব তাঁকে আত্মস্থ করার চেষ্টা করেছিলাম। অদ্ভুত একটা জোর, একটা আত্মবিশ্বাস পেতাম যখন ওই বেশে ক্যামেরার সামনে আসতাম। কোথা থেকে পেতাম, সেটা আমি জানি না। কিন্তু পেতাম। পরবর্তী সময়ে নানান রঙের চরিত্রে অভিনয় করেছি বটে কিন্তু স্বামী বিবেকানন্দের চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ আমার জীবনে অন্যতম সেরা প্রাপ্তি, এইটুকু বলতে পারি।”

সামান্য থেমে সাহেব আরও বলে চলেন, “এরপর ২০১৩ সালে ফের স্বামীজীর চরিত্রে মঞ্চে আসার সুযোগ পাই। সিডনি অপেরা হাউজ। ২০১৩ সালের ১৭ এবং ১৮ সেপ্টেম্বর প্রথম বাঙালি হিসেবে সিডনি অপেরা হাউজে পারফর্ম করেছিলাম। একাধিকবার অডিশন দিতে হয়েছিল। জানিয়ে রাখি, সেই অডিশন কিন্তু হয়েছিল গোটা ভারত জুড়ে। যাই হোক, সে এক রোমহর্ষক অভিজ্ঞতা। প্রথম থেকেই তাহলে খুলেই বলি।
আমি ওঁদের সব শর্তেই রাজি হয়েছিলাম, কিন্তু কেবল নিজের তরফে একটি শর্ত রেখেছিলাম। বলেছিলাম, নাটক যেহেতু ইংরেজিতে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের থিয়েটারকর্মীরা এতে যুক্ত রয়েছেন তাই বলাই বাহুল্য ইংরেজি সংলাপ বলতে আমার বিন্দুমাত্র আপত্তি বা অসুবিধে কোনওটাই নেই, কিন্তু নাটকের দু'টি গান আমি বাংলাতেই গাইব। ইংরেজি অনুবাদে গাইতে পারব না শ্যামাসঙ্গীত।

এই থিয়েটারের মাহাত্ম্য ছিল পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অভিনেতা-অভিনেত্রীরা অভিনয় করেছিলেন। কেউ শ্রীলঙ্কা, কেউ পোল্যান্ড, নাইজেরিয়া, সাউথ আফ্রিকা, প্যালেস্টাইন আবার কেউ বা স্কটল্যান্ড ইংল্যান্ডের নাগরিক ছিলেন। আর অস্ট্রেলিয়ার শিল্পীরা তো ছিলেন-ই। খুব ভাল করে মনে আছে, এই নাটকে পরমহংস রামকৃষ্ণের ভূমিকায় যিনি অভিনয় করেছিলেন রবার্ট রোড, তিনি কিন্তু একজন আফ্রিকান অভিনেতা ছিলেন! কিন্তু তাঁর মুখের সঙ্গে ঠাকুরের অদ্ভুত মিল ছিল। আবার, মা কালীর ভূমিকায় যিনি মঞ্চে আসতেন তিনি প্রায় সাড়ে ছ’ফুট উচ্চতার এক নাইজেরীয় অভিনেত্রী। সিস্টার নিবেদিতার চরিত্রে যিনি অভিনয় করতেন, তিনি একজন প্যালেনস্টিনিয়ান অভিনেত্রী।

যাই হোক, একটি ঘটনা বলি এই নাটকের সঙ্গে জড়িত যা আমার কাছে প্রায় অলৌকিক পর্যায়ের। তখন আমার বাবা খুব অসুস্থ। ক্যানসারে আক্রান্ত। নাটক শুরু হবে, ফার্স্ট বেল প্রায় পড়বে পড়বে।...এমন সময়ে আমার স্ত্রী মিলি এসে আমাকে খবর দিল বাবার শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে, স্যাচুরেশনফল করছে! শোনামাত্রই আমি তো দিশেহারা। চোখ উপচে জল এল, অভিনয় করব কী ঝরঝর করে কেঁদে চলেছি। আমার অবস্থা দেখে একে একে আমার সহ-অভিনেতা, অভিনেত্রীরা এগিয়ে এলেন। সবাই মিলে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘যাও মঞ্চে যাও। ঠাকুর রামকৃষ্ণের কথা ভাবো। তিনি-ই তোমাকে উদ্ধার করবেন, পথ দেখবেন। এস।’ বিশ্বাস করুন, চোখের জল মুছে নিজের সর্বস্বটুকু দিয়ে মঞ্চে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। তখন মনে হচ্ছিল, সত্যিই পরমহংস আমার পাশে রয়েছেন এই বিপদে। আর কিচ্ছু মাথায় আসেনি আর। নাটক শেষে যখন গোটা প্রেক্ষাগৃহ দাঁড়িয়ে উঠে হাততালি দিচ্ছে, আমার স্ত্রী চিৎকার করে জানিয়েছিল, ‘এইমাত্র খবর এল, বাবা এখন ভাল আছে। আস্তে আস্তে ঠিক হচ্ছেন আবার।’ কী বলবেন এই ঘটনাকে! আমার কাছে কোনও ব্যাখ্যা নেই। দেশে ফেরার পর আরও দেড় মাস বাবা আমাদের মধ্যে ছিলেন।”
কথাশেষে আবেগে বুজে আসে সাহেবের গলা। তিনি যোগ করেন, “স্বামীজী প্রকৃত সাম্যবাদে বিশ্বাস করতেন। উনি বিশ্বাস করতেন, যে শক্তি আমাদের চালাচ্ছেন, যাকে আমরা ঈশ্বর বলি তাঁর কিন্তু কোনও ধর্ম হয় না। আর বলতেন, নিজের বিশ্বাসের প্রতি অটুট রাখার পাশাপাশি অদেখা-অজানা ভয়ের কাছে নতজানু না হয়ে তার মুখোমুখি হতে। আমি ওঁর এই দেখানো পথেই চলার চেষ্টা করে যাই আজও।”
