জীবন কি সত্যিই মাঝে মাঝে কোনও এক অদৃশ্য পরিচালকের ইশারায় সিনেমার চিত্রনাট্য হয়ে ওঠে? গত মার্চ মাসে ওড়িশার তালসারির সমুদ্রে শুটিং করতে গিয়ে মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারিয়েছিলেন টলিউডের অত্যন্ত জনপ্রিয় ও প্রতিভাবান অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। আজ প্রায় চার মাস কেটে গেলেও টলিপাড়ার বুকে সেই ক্ষত এখনও দগদগে। আর ঠিক এই আবহেই, ছবির ট্রেলার মুক্তির সঙ্গে সঙ্গে যেন পর্দায় সশরীরে, জীবন্ত হয়ে ফিরে এলেন রাহুল। ওঁর চলে যাওয়ার শূন্যতা আর ছবির ট্র্যাজিক স্ক্রিপ্ট মিলেমিশে দর্শক ও সহ-অভিনেতাদের চোখ আরও একবার ভিজিয়ে দিচ্ছে।

‘ছবিওয়ালা’ সিনেমাটি স্রেফ কোনও সাধারণ বিনোদন নয়, এটি দৈনন্দিন জীবনে একজন খাঁটি শিল্পী ও ওঁর শিল্পের টিকে থাকার এক নির্মম, হাড়হিম করা গল্প। ছবিতে রাহুল অভিনয় করেছেন 'বিশ্বকর্মা ' নামের এমন এক অদ্ভুত ও শৈল্পিক ফটোগ্রাফারের চরিত্রে, যে সমাজের আধুনিক চাকচিক্যের ইঁদুরদৌড়ে পুরোপুরি বাতিল। ওঁর কপালে এখন আর কোনও ব্রাইডাল বা গ্ল্যামার শুটের ডাক আসে না; ওঁর ডাক পড়ে শুধু মৃত মানুষের ‘শেষ ছবি’ তোলার জন্য।অবহেলা আর অপমানে জর্জরিত সেই ফটোগ্রাফারের মনে হয়, ওঁর ক্যামেরাবন্দি মৃত আত্মারাও যেন অবসরে ওঁর শিল্পের দিকে তাকিয়ে ব্যঙ্গাত্মক হাসি হাসছে! যে ছবি স্রেফ ব্যবসার জন্য বিক্রি হয়, অন্তরের তাগিদ না থাকায় সেই ছবি রাহুল তুলে উঠতে পারেন না।
এদিকে ওঁর স্ত্রী মালা (যে চরিত্রে অভিনয় করেছেন দেবলীনা দত্ত) দিনরাত এক করে কারখানায় হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে সংসারের খরচ জোগায়। প্রবল টানাটানির মধ্যেও কোথাও একটা তার স্বামীর প্রতি একধরণের সম্মান মেশানো মমত্ববোধ কাজ করে। স্বামী-শরীরের মধ্যে অগাধ ভালবাসা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা থাকলেও— শুধু তো ভালবাসা দিয়ে পেট ভরে না! মধ্যবিত্তের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া খিদের জ্বালায় শেষ পর্যন্ত এক চরম ও ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত নেয় এই দম্পতি।
যে নিখুঁত ফ্রেমের খোঁজে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর পাগলের মতো ঘুরে বেরিয়েছে সেই ‘ছবিওয়ালা’, একদম শেষে এসে হতাশার চরম অন্ধকারে দাঁড়িয়ে সে তুলে আনে ওঁর জীবনের শেষ মর্মান্তিক ছবিটি। আর ওঁর জীবনের সেই চরম ট্র্যাজেডিই ওঁর শিল্পকে এনে দেয় সেই বহুকাঙ্ক্ষিত সামাজিক ও আর্থিক সাফল্য। কিন্তু তখন কি আর সব ঠিকঠাক থাকে? শান্তনু নাথের মর্মস্পর্শী লেখায়, নির্দেশক বাপ্পা বুনেছেন একজন অসহায় শিল্পীর জীবনের এই ঘাত প্রতিঘাতেরই গল্প।
রাহুল এবং দেবলীনা দত্তর অভিনয় সমৃদ্ধ ছবিটিতে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় রয়েছেন শান্তনু নাথ, রানা বসু ঠাকুর এবং রিমি দেব। এছাড়াও একটি অত্যন্ত বিশেষ এবং বলিষ্ঠ চরিত্রে দেখা যাবে অভিনেত্রী শ্রীলেখা মিত্রকে।
প্রসঙ্গত, এর আগে মধ্য কলকাতার একটি প্রথম সারির প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছিল এই ছবির গান ও পোস্টার। পরিচালক বাপ্পা জানিয়েছিলেন, ছবিটির নাম প্রথমে রাখা হয়েছিল ‘নেগেটিভ’, যা গল্পের মেজাজ ও ভাবনার সঙ্গে দারুণ সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। কিন্তু শুটিং শেষ হতে না হতেই রাহুলের এই আকস্মিক মৃত্যু শিল্পী হিসেবে গোটা টিমকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়। সেই গভীর শোক ও আবেগ থেকেই ছবির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘ছবিওয়ালা’। এক সত্যিকারের ‘ছবিওয়ালা’-কে শ্রদ্ধা জানাতেই এই ছবিটিকে রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতিতে উৎসর্গ করেছেন নির্মাতারা।
















