পর্দায় তিনি ‘দবং’ গার্ল। কিন্তু বাস্তবেও যে তিনি মুখের ওপর সত্যি কথা বলতে এবং প্রতিবাদের আঁচ বাড়াতে একটুও পিছপা হন না, তা আরও একবার প্রমাণ করে দিলেন সোনাক্ষী সিনহা। ভারতের এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় জ্বলন্ত ইস্যু— রাজধানী দিল্লিতে বিখ্যাত পরিবেশবিদ ও শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুকের আমরণ অনশন। সর্বভারতীয় স্তরে নিট-ইউজি (NEET-UG) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং দুর্নীতিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র এই তীব্র আন্দোলনের মাঝে এবার সরাসরি ঝাঁঝালো বার্তা নিয়ে অবতীর্ণ হলেন শত্রুঘ্ন-কন্যা। চলতি অনশনের ১৯তম দিনে দাঁড়িয়ে সোনম ওয়াংচুকের স্বাস্থ্যের চরম অবনতি এবং এই বিষয়ে সরকারের নীরবতাকে আর মুখ বুজে সহ্য করতে পারলেন না সোনাক্ষী। নিজের ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেলে একটি কড়া ভিডিও বার্তা শেয়ার করে তিনি সাফ বললেন, “আমি কোনও দেশদ্রোহী নই!”

সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা ওই ভিডিওতে স্পষ্টতই বিচলিত ও ক্ষুব্ধ শোনাল সোনাক্ষীকে। সমাজের প্রভাবশালী ও বড় বড় ব্যক্তিত্বদের নীরবতাকে কাঠগড়ায় তুলে তিনি বলেন, “আমি জীবনে কোনওদিন এই ধরনের প্রকাশ্য রাজনৈতিক বা সামাজিক বিষয়ে কোনও বিবৃতি দিইনি। কিন্তু আজ আমরা এই মানুষটাকে কোনওভাবেই উপেক্ষা করতে পারি না। সোনম ওয়াংচুক— আমরা সবাই ওঁকে চিনি। আমাদের দেশের জন্য উনি কী করেছেন, ওঁর কৃতিত্ব কী, কত সম্মান উনি পেয়েছেন, তা কারও অজানা নয়।”

টানা ১৮-১৯ দিন ধরে অন্ন-জল ত্যাগ করা ওয়াংচুকের যন্ত্রণার কথা মনে করিয়ে দিয়ে অভিনেত্রী আরও বলেন— “উনি ক্ষুধার্ত। ১৮ দিন ধরে কিছু খাননি। কার জন্য করছেন উনি এসব? যে সমস্ত ছেলেমেয়েরা দুর্নীতির বলি হয়ে নিজেদের জীবন হারিয়েছে, উনি তাদের ভবিষ্যতের জন্য লড়ছেন। উনি লড়াই করছেন একটা ভেঙে পড়া, অচল সিস্টেমের বিরুদ্ধে। এটা আমি জানি, আপনি জানেন, আমরা সবাই জানি।”
বলিউডের একটা বড় অংশ যেখানে এই ধরনের স্পর্শকাতর ইস্যুতে সবসময় নিজেদের গুটিয়ে রাখে, সেখানে সোনাক্ষীর এই ‘ডোন্ট কেয়ার’ মনোভাব টিনসেল টাউনে আলোড়ন ফেলে দিয়েছে। মোক্ষম টোনে তিনি প্রশ্ন তোলেন, “বহু মানুষ এখনও চুপ করে আছেন। কিন্তু আমি আর চুপ থাকতে পারলাম না। এর পরিণামে যা হওয়ার হবে, কোনও পরোয়া করি না। কিন্তু আমি আর মুখ বন্ধ রাখব না।”

একইসঙ্গে সরকারের কাছে হাত জোড় করে অবিলম্বে এই অচলাবস্থা কাটানোর এবং ওয়াংচুকের সাথে সরাসরি আলোচনায় বসার দাবি জানিয়েছেন সোনাক্ষী। ওঁর প্রশ্ন, “কেন কেউ ওঁর কথা শুনছেন না? কারও কিচ্ছু যায় আসে না? কেউ একটা আলোচনার টেবিলে বসার জন্যও তৈরি নন কেন?” নিজের দেশপ্রেমের প্রমাণ দিয়ে সোনাক্ষী ভিডিওর শেষে সগর্বে বলেন— দেশের ভাল চেয়ে কথা বললে কেউ ‘দেশদ্রোহী’ হয়ে যায় না।

তবে সোনম ওয়াংচুক এবং সিজেপি-র এই আন্দোলনের সমর্থনে সোনাক্ষীই প্রথম নন। এর আগেই বলিউডের একঝাঁক তারকা এই অনশনকে সমর্থন জানিয়েছেন। প্রবীণ অভিনেত্রী জিনাত আমন ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ওয়াংচুকের স্বাস্থ্যের অবনতি নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে লিখেছেন— “খবরে পড়লাম ওয়াংচুক সাহেবের শরীরের পেশী গলতে শুরু করেছে এবং উনি মারাত্মক যন্ত্রণার মধ্যে আছেন। যখন ওঁকে অনশন ভাঙতে বলা হয়, উনি বলেন— আমাকে অনশন ভাঙতে বলবেন না, সরকারকে গিয়ে জিজ্ঞেস করুন কেন তারা একটা দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় বসতেও ভয় পাচ্ছে।”  পাশাপাশি আমির খানের ‘৩ ইডিয়টস’ ছবির সেই বিখ্যাত ‘চতুর’ অর্থাৎ অভিনেতা ওমি বৈদ্য-ও সোনম ওয়াংচুকের সমর্থনে এগিয়ে এসেছেন। উল্লেখ্য, ‘৩ ইডিয়টস’ ছবির আমির খানের চরিত্রটি (ফুংসুখ ওয়াংড়ু) আংশিকভাবে সোনম ওয়াংচুকের বাস্তব জীবন ও ওঁর বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের অনুপ্রেরণাতেই তৈরি হয়েছিল। ওমি বৈদ্য দেশবাসীকে ওয়াংচুকের এই আন্দোলনের গভীরতা বোঝার এবং ওঁর জীবন বাঁচানোর জন্য আওয়াজ তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। এছাড়াও প্রকাশ রাজ, নাসিরুদ্দিন শাহ, রত্না পাঠক শাহ এবং অভয় দেওলের মতো বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বরা ইতিমধ্যেই এই প্রতিবাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন।

চিকিৎসকদের বুলেটিন অনুযায়ী, ১৯ দিনে পা দেওয়া সোনম ওয়াংচুক ইতিমধ্যেই ৯ কেজিরও বেশি ওজন হারিয়েছেন এবং ওঁর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দিল্লি হাইকোর্ট অবশ্য রাজ্য ও কেন্দ্র সরকারকে প্রতিদিন ওঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার কড়া নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু এতকিছুর পরেও অনশন ভাঙতে নারাজ ওয়াংচুক। সিজেপি-র আগামী ২০শে জুলাইয়ের প্রস্তাবিত ‘চলো সংসদ’ মার্চকে সফল করার ডাক দিয়েছেন তিনি। এই পরিস্থিতিতে সোনাক্ষী সিনহার মতো প্রথম সারির মূলধারার অভিনেত্রীর এই বিস্ফোরক বয়ান যে প্রতিবাদের আগুনে ঘৃতাহুতি দিল, তা বলাই বাহুল্য!