বলিউডে একটা দীর্ঘ সময় ধরে এক অলিখিত নিয়ম ছিল— অভিনেত্রীদের বিয়ের পিঁড়িতে বসা মানেই কেরিয়ারে ইতি। পুরুষ তারকারা যেখানে বিয়ের পরও দশকের পর দশক দাপিয়ে রাজত্ব করতেন, সেখানে সাত, আট বা নয়ের দশকের প্রথম সারির নায়িকারা বিয়ের পর একপ্রকার বাধ্য হয়েই লাইমলাইটের আড়ালে চলে যেতেন। কেরিয়ারের একেবারে মধ্যগগনে থাকা অবস্থায় হঠাৎ রুপোলি পর্দা থেকে আচমকা উধাও হয়ে যাওয়া এমনই এক অত্যন্ত জনপ্রিয় নাম— কিমি কাটকর।
আটের দশকের শেষ এবং নয়ের দশকের শুরুতে বলিউডের অন্যতম সেরা গ্ল্যামারাস ও সাহসী অভিনেত্রী ছিলেন তিনি। অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে ‘হম’ ছবিতে ওঁর সেই আইকনিক নাচ ‘জুম্মা চুম্মা দে দে’ আজও প্রতিটি ভারতীয়র মনে তরতাজা। কিন্তু এই তুমুল জনপ্রিয়তার মাঝেই হঠাৎ কেন বলিউডকে আলবিদা জানিয়েছিলেন এই ‘তারজান গার্ল’? দীর্ঘ বছর পর ওঁর সেই সিদ্ধান্ত এবং বর্তমান জীবন নিয়ে মুখ খুললেন অভিনেত্রী।
অভিনেত্রী মীনা ফার্নান্দেজের কন্যা কিমি মাত্র ১৭ বছর বয়সে মডেল হিসেবে গ্ল্যামার দুনিয়ায় পা রাখেন। ওঁর আত্মবিশ্বাস এবং পর্দায় দারুণ উপস্থিতি খুব দ্রুত পরিচালকদের নজর কাড়ে। ১৯৮৫ সালে একটি পার্শ্বচরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে ওঁর বলিউড সফর শুরু হলেও, সেই বছরই মুক্তিপ্রাপ্ত ‘অ্যাডভেঞ্চারস অফ টারজান’ ছবিতে কিমির সাহসী দৃশ্য ওঁকে রাতারাতি তারকা বানিয়ে দেয়। বলিপাড়ায় ওঁর নাম হয়ে যায় “টারজান গার্ল”।
এরপর আর ওঁকে পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ‘লাহু’, ‘দরিয়া দিল’, ‘সোনে পে সুহাগা’, ‘গৈর কানুনী’-র মতো একের পর এক বাণিজ্যিক ছবিতে অভিনয় করতে থাকেন তিনি। ওঁর ব্যস্ততা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, ১৯৮৯ সালে মাত্র একটা বছরেই ওঁর ১৫টি ছবি মুক্তি পেয়েছিল! তবে ১৯৯১ সালে অমিতাভ বচ্চনের ‘হাম’ ছবির ‘জুম্মা চুম্মা’ গানটি ওঁকে দেশজুড়ে সেনসেশনে পরিণত করে।
১৯৯২ সালে খ্যাতির চূড়ায় থাকাকালীন হঠাৎই পেশাদার আলোকচিত্রী ও বিজ্ঞাপন নির্মাতা শান্তনু শোরি-কে বিয়ে করেন কিমি। আর বিয়ের পরেই চলচ্চিত্র জগত থেকে পুরোপুরি সন্ন্যাস নেন তিনি। ২০২৫ সালে ইউটিউব চ্যানেলে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে বলিউড থেকে ওঁর সেই আচমকা সরে যাওয়ার সিদ্ধান্তের আসল কারণ খোলসা করেন কিমি। তাঁর কথায়, “আমার অভিনীত সব ছবি এতটা জনপ্রিয় হওয়া সত্ত্বেও ইন্ডাস্ট্রি ছেড়ে দেওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল, সেই সময়ে দাঁড়িয়ে আমি নিজের পেশাদার জীবন এবং ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার কথা ভাবতেই পারতাম না। তৎকালীন সময়ে ইন্ডাস্ট্রির নিয়ম ছিল— পর্দায় তোমাকে সিঙ্গেল দেখাতে হবে, বাস্তবেও সিঙ্গেল থাকতে হবে। তুমি কারও সঙ্গে ডেট করতে পারবে না, কারণ দর্শক যাতে পর্দায় তোমাকে দেখে ভাবে যে তুমি শুধু তাদেরই! আমি তখন উপলব্ধি করি, আমার একটাই জীবন। আমি মডেলিং করেছি, সিনেমা করার সুযোগ পেয়েছি এবং দেশের সেরা অভিনেতা অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গেও কাজও করেছি। এবার আমি একজন তরুণী মা হতে চেয়েছিলাম।”
বিয়ের পর মুম্বইয়ের কোলাহল ছেড়ে স্বামী ও ছেলেকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় চলে যান কিমি। প্রধানত ছেলের চিকিৎসার জন্যেই। সেখানে বেশ কয়েক বছর কাটানোর পর ছেলের পড়াশোনার জন্য ভারতে ফিরে পুণেতে বসবাস শুরু করেন তিনি। নয়ের দশকের অন্য তারকাদের মতো ওঁকে কখনও কোনও রিয়ালিটি শো বা কামব্যাক প্রজেক্টে দেখা যায়নি। লাইমলাইট থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ দূরে রেখেছেন তিনি।
সাক্ষাৎকারে কিমি জানান, বর্তমানে তিনি ও ওঁর পরিবার গোয়ায় স্থায়ীভাবে থিতু হয়েছেন। এখন তিনি এক মিষ্টি নাতনির ঠাকুমা এবং ওঁর বর্তমান জীবন অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ। অভিনয়ের পাট চুকিয়ে কিমি ওঁর নতুন এক প্যাশন খুঁজে পেয়েছেন। তিনি বাণিজ্যের ধারা বদলে ছ'মাসের একটি প্রফেশনাল বেকিং কোর্স সম্পন্ন করেছেন এবং এখন গোয়ার বাড়িতে মনের আনন্দে কেক-পেস্ট্রি বেক করতে ভালবাসেন। রুপোলি পর্দার সেই ‘জুম্মা চুম্মা’ গার্ল আজ গ্ল্যামার দুনিয়া থেকে দূরে এক সাধারণ, শান্ত ও সুখী গৃহকোণ বেছে নিয়েছেন।















