২০২৫ সালের নভেম্বরের সেই অভিশপ্ত দিনটা এখনও ভোলেনি আসমুদ্রহিমাচল। ৮৯ বছর বয়সে চিরবিদায় নিয়েছেন বলিউডের ‘হিম্যান’ ধর্মেন্দ্র। আর তাঁর মৃত্যুর রেশ কাটতে না কাটতেই বি-টাউনের অলিতে-গলিতে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল এক নতুন বিতর্ক। রটে গিয়েছিল, ধর্মেন্দ্রর চলে যাওয়ার পর নাকি সৎ ছেলে সানি এবং ববি দেওলের সাথে হেমা মালিনীর সম্পর্কের তিক্ততা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেওল পরিবারের অন্দরের ফাটল নিয়ে যখন মুখরোচক গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, ঠিক তখনই সব জল্পনায় জল ঢেলে এক বিস্ফোরক ও অকপট সাক্ষাৎকারে মুখ খুললেন স্বয়ং ‘ড্রিম গার্ল’। স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, বাইরের মানুষজন যাই বলুক না কেন, ধর্মেন্দ্রর সন্তানরা আজও কতটা একজোট।
এক সাক্ষাৎকারে হেমা মালিনী তুলে ধরলেন ধর্মেন্দ্রর জীবনের শেষ দিনগুলোর কিছু না-বলা কথা। হেমা বলেন, "ধরমজি সবসময় একটা কথাই বলতেন— বাচ্চাদের সঙ্গে যতটা সম্ভব বেশি সময় কাটাও। পরিবারকে সময় দাও। তিনি সবসময় বলতেন, আজকের এই কঠিন সময়ে পরিবারের সবার একজোট হয়ে থাকাটা ভীষণ জরুরি। আজকাল তো চারদিকে শুধু বিচ্ছিন্নতা, ছেলেমেয়েরা যে যার মতো আলাদা হয়ে যায়। কিন্তু ধরমজি এটা একেবারেই পছন্দ করতেন না।"
কথাপ্রসঙ্গেই অবধারিতভাবে উঠে আসে সেই অমোঘ প্রশ্ন— মৃত্যুর আগে বলিউডের এই বর্ষীয়ান তারকার শেষ ইচ্ছে ঠিক কী ছিল? এক মুহূর্তও না লুকিয়ে হেমা ভাগ করে নিলেন সেই আবেগঘন মুহূর্তের কথা। তিনি জানান, "তিনি ঠিক এই কথাটাই বারবার বলে গিয়েছিলেন— 'পরিবারের সঙ্গে থেকো। সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে থেকো। কাজ তো সারাজীবন চলতেই থাকবে, কিন্তু পরিবারকে সবসময় সবকিছুর আগে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।'"
প্রথম পক্ষের সন্তানদের সঙ্গে তাঁর সমীকরণ ঠিক কেমন, তা নিয়ে বিন্দুমাত্র রাখঢাক না করেই হেমা বলেন, "ওরা প্রত্যেকেই ভীষণ মিষ্টি। সানি ভীষণ ভাল ছেলে, ববিও অত্যন্ত ভাল। আমরা সবসময় একে অপরের পাশে আছি, সবাই একসঙ্গেই আছি। আমরা এটা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে কোনও সস্তা প্রচার করি না ঠিকই, কিন্তু ভেতরের সত্যিটা হল আমরা প্রত্যেকে ভাল আছি। আমাদের মধ্যে কোনও দূরত্ব নেই, আমরা সবাই একজোট। আমরা একটা ভীষণ সুখী পরিবার।
সাক্ষাৎকারে ধর্মেন্দ্রর মানবিক সত্তাকে কুর্নিশ জানিয়ে হেমা কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। ভক্তদের জন্য ধর্মেন্দ্রর মনে সবসময় এক আলাদাই শ্রদ্ধা আর ভালবাসা ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, "কেউ যদি তাঁর সঙ্গে একটা ছবি তুলতে আসত, ধরমজি বলতেন, 'ওদের ভেতরে ডেকে নাও'— তিনি দেখতেন না সামনের মানুষটা কে। তিনি সবার সঙ্গে নিজে দেখা করতেন, সবাইকে পেট পুরে খাওয়াতেন। মানুষকে ভালোবাসতে পারতেন তিনি।"
শুধু একজন মহান অভিনেতাই নন, হেমা মনে করিয়ে দেন যে ধর্মেন্দ্র ছিলেন একজন "অত্যন্ত স্নেহশীল বাবা" এবং একজন "অসাধারণ দাদু"। বাবার চলে যাওয়ার পর সন্তানরা যে কতটা শূন্যতা আর একাকীত্বে ভুগছে, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয় বলেও জানান তিনি।
ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতীয় সিনেমার রুপোলি পর্দা শাসন করা ধর্মেন্দ্র গত ২৪ নভেম্বর, ২০২৫-এ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কাকতালীয়ভাবে, তাঁর ৯০তম জন্মদিনের ঠিক কয়েকটা দিন আগেই থমকে যায় তাঁর জীবন। 'শোলে', 'চুপকে চুপকে', 'মেরা গাঁও মেরা দেশ', 'ধরম বীর'-এর মতো কালজয়ী ক্লাসিক উপহার দিয়ে তিনি কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে অমর হয়ে আছেন।
জীবনের শেষ পর্বেও তাঁর অভিনয়ের জাদু ম্লান হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে 'রکی অউর রানি কি প্রেম কাহানি' এবং 'তেরি বাতোঁ মে অ্যায়সা উলঝা জিয়া' সিনেমা দুটিতে তাঁর অভিনয় নতুন করে দর্শকদের চোখে জল এনেছিল। মরণোত্তর মুক্তি পেয়েছে শ্রীরাম রাঘবনের পরিচালনায় তাঁর জীবনের শেষ ছবি 'ইক্কিস'। এই যুদ্ধভিত্তিক ড্রামায় ধর্মেন্দ্র ছাড়াও অভিনয় করেছেন অগস্ত্য নন্দা, জয়দীপ আহলাওয়াত, প্রয়াত অভিনেতা আসরানি, সিকান্দার খের এবং বিভান শাহ। হেমা মালিনীর এই সাক্ষাৎকার যেন আরও একবার প্রমাণ করে দিল— রূপোলি পর্দার ‘হিম্যান’ বাস্তবেও ছিলেন তাঁর গোটা পরিবারের আসল স্তম্ভ।















